দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও নেমেছে নির্বাচনী উত্তাপ। কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের দীর্ঘ ছায়া পেরিয়ে জাতি এগোচ্ছে এক বহুল প্রত্যাশিত মাহেন্দ্রক্ষণের দিকে। আর মাত্র ১৯ দিন পর—১২ই ফেব্রুয়ারি—সেই দিনটি আসছে, যেদিন প্রায় দেড় দশক পর দেশের মানুষ অবাধভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা।
এই নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয় বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার জন্য এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মোড়।
বিগত বছরগুলোতে যে নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ অংশগ্রহণ, অনাস্থা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এবারের নির্বাচন জনগণের কাছে নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। জনগণ প্রত্যাশা করছে—এই নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আজ থেকে মোট ২০ দিন নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। এই সময়সীমা চলবে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মোট ১,৯৭৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল প্রার্থী দিয়েছে, যা সাম্প্রতিক নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এটি নিঃসন্দেহে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় বহুমাত্রিকতা ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে, প্রচারণা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে নেমেছে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোও। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, নির্বাচনী তদন্ত কমিটি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সকলেই সক্রিয় হয়েছে। সংক্ষিপ্ত বিচারের ক্ষমতা নিয়ে তদন্ত কমিটির তৎপরতা এবং প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের মোতায়েন নির্বাচনকে সুশৃঙ্খল রাখতে কর্তৃপক্ষ তথা রাষ্ট্রের প্রস্তুতির চিত্রই তুলে ধরে।
এবারের নির্বাচন পরিচালিত হবে ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫’ অনুযায়ী। নির্বাচন কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—এই বিধিমালা লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ নেই। আচরণবিধি ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং প্রয়োজনে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে ইসির হাতে।
এই বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—পোস্টারবিহীন নির্বাচন।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এটি এক নতুন অধ্যায়। পোস্টার, পিভিসি ব্যানার, প্লাস্টিক ফেস্টুন নিষিদ্ধ করে পরিবেশবান্ধব প্রচারণার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে অর্থ ও পেশিশক্তির অপব্যবহারও কমবে বলে আশা করা যায়।
আধুনিক নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বড় ভূমিকা রাখে—এ কথা নির্বাচন কমিশন অস্বীকার করেনি। তবে সেই ভূমিকা যেন গণতন্ত্রের জন্য হুমকি না হয়, সে জন্য আরোপ করা হয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। প্রার্থী বা দলের পক্ষ থেকে যে কোনো ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের আগে তা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও, ছবি বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ঘৃণাত্মক বক্তব্য, নারী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার, চরিত্রহনন—সবকিছুর ওপর রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচনে এআই অপব্যবহারের যে ভয়াবহ উদাহরণ দেখা গেছে, বাংলাদেশ যেন সেই ফাঁদে না পড়ে—এটাই এই বিধিনিষেধের মূল উদ্দেশ্য।
নির্বাচনী মাঠে সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই একটি অবাধ নির্বাচনের মূল শর্ত। সে কারণেই শোডাউন, গাড়িবহর, মশাল মিছিল, ড্রোন ব্যবহার, আলোকসজ্জা, তোরণ নির্মাণ—সবই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন, তাও নির্দিষ্ট মাপ ও শর্তে।
এবার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা। ফলে তারা কোনো প্রার্থীর হয়ে প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। এটি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
সব নিয়ম-কানুন, সব প্রস্তুতি শেষ পর্যন্ত অর্থবহ হবে তখনই, যখন ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন। বর্তমানে দেশে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণই নির্বাচনকে বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা দেবে।
দীর্ঘ সময় ভোটাধিকার কার্যত স্থগিত থাকার অভিজ্ঞতা ভোটারদের মধ্যে একধরনের অনাস্থা তৈরি করেছিল। এবারের নির্বাচন সেই আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ। ভোটারদের দায়িত্ব শুধু ভোট দেওয়া নয় বরং তারা যেন কোনো গুজব, ভয় বা প্রলোভনের কাছে নতি স্বীকার না করেন—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলীর ভাষায়, “প্রতীক বরাদ্দ হয়ে গেছে। এখন আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করাই ইসির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইসিকে হতে হবে দৃঢ়, নিরপেক্ষ ও সাহসী। কোনো প্রার্থীই যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে—এই বার্তাটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করাই কমিশনের সাফল্যের মাপকাঠি হবে।
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, পর্যবেক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যমের দায়িত্ব থাকবে তথ্যভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন করা। একই সঙ্গে ভুল তথ্য ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা।
নাগরিক সমাজকে নজরদারি ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে হবে। নির্বাচন মানেই কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয় বরং এটি একটি জাতীয় উৎসব—এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
১২ই ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। যদি নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, গণমাধ্যম এবং ভোটার—সকলেই নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। তবে এই নির্বাচন ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দীর্ঘ কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের অবসানের পর এই নির্বাচন হতে পারে নতুন বাংলাদেশের পথে এক শক্ত ভিত্তি। সেই প্রত্যাশা নিয়েই শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রচার। এখন দেখার বিষয়—এই প্রত্যাশা কতটা বাস্তবতায় রূপ নেয়।
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল একটি দাবি নয় বরং এটি একটি জাতির অধিকার। ১২ই ফেব্রুয়ারি হোক সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন-এটাই গণতন্ত্র কামী প্রতিটি মানুষের প্রত্যাশা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
আজকালের খবর/ এমকে