ফিদেল কাস্ত্রোর সেই অমর উক্তি—“Men do not shape destiny. Destiny produces the man for the hour.”অর্থাৎ, মানুষ নিজে ভাগ্যকে গড়ে তোলে না; বরং ইতিহাসের নির্ধারিত ক্ষণে ভাগ্যই জন্ম দেয় তার উপযুক্ত মানুষকে—এই উক্তিটি যেন অবিকল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবনের জন্যই লেখা।
আজ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী। এই দিনে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে বহু আলোচনাই হবে—স্মৃতিচারণ, মূল্যায়ন, ইতিহাসের পুনর্পাঠ। কিন্তু সময়ের সীমাবদ্ধতায় আমি ইতিহাসের দীর্ঘ বর্ণনায় না গিয়ে শহীদ জিয়ার জীবনের কয়েকটি সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর বাঁক, কিছু স্থিরচিত্রের মতো মুহূর্ত তুলে ধরতে চাই। হয়তো আমি পুরোপুরি নির্মোহ থাকতে পারবো না—কারণ কিছু মানুষ শুধু ইতিহাসের বিষয় হয় না, তারা অনুভবের অংশ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন কর্মী হিসেবে শহীদ জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করা কেবল দলীয় আনুগত্যের প্রকাশ নয়; এটি আমাদের ইতিহাসবোধকে জাগ্রত করার এক গভীর প্রয়াস। বিস্ময় জাগায় এই সত্যটি—ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও অতি সংক্ষিপ্ত সময়ে কীভাবে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ের গভীরে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে গেলে হৃদয় ও বিবেক—দুটোকেই একসাথে ব্যবহার করতে হয়।
শহীদ জিয়া কেবল আমাদের নয়—তিনি ছিলেন বিশ্বের বহু মনীষীর শ্রদ্ধার মানুষ। মওলানা ভাসানী থেকে শুরু করে আধুনিক সিঙ্গাপুরের রূপকার লি কুয়ান ইউ, কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ মুহাম্মদ আলী থেকে শুরু করে বিদেশি গবেষক, শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব—এমনকি এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের কাছেও তিনি ছিলেন আপনজন।
তিনি এমন এক জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, যা সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে শুধু দাঁড় করায়নি—মেরুদণ্ড সোজা করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি গর্ব—এই চেতনাগুলো শহীদ জিয়াই জাতির হৃদয়ে প্রোথিত করেছিলেন। আন্তর্জাতিক পরিসরেও তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশকে আত্মবিশ্বাসের সাথে বাঁচতে শিখিয়েছিল।
আজ তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ নেই। তাই আমি কেবল তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী জীবনের দুইটি দিকের কথা বলবো—একজন সামরিক যোদ্ধা ও একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে।
একজন পেশাদার সামরিক অফিসার হিসেবে শহীদ জিয়া মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে দুইটি ভিন্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন (১৯৬৫ ও ১৯৭১) এবং উভয় যুদ্ধেই বীরত্বের স্বাক্ষর রাখেন। স্বাধীনতার সময় রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন দিকহীন, তখন প্রথম প্রহর থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রামের কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর কাঠামো নির্মাণ, কুড়িগ্রামের রৌমারিতে প্রথম স্বাধীন বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। অথচ এই মানুষটি কখনোই কৃতিত্ব দাবি করেননি।
ঠিক তেমনি, একেবারে ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে থাকা রাষ্ট্রক্ষমতা যখন ১৯৭৫ সালের রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর তাঁর হাতে আসে, তখনও তিনি ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হননি। ইতিহাস সাক্ষী—বিশ্বজুড়ে অসংখ্য সামরিক শাসক ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। কিন্তু শহীদ জিয়া ছিলেন ব্যতিক্রম।
তিনি সামরিক পোশাক পরেই নিষিদ্ধ গণতন্ত্রের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। বহুদলীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—ক্ষমতা নয়, জনগণই রাজনীতির মূল শক্তি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্কাস ফ্রান্ডা তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থ Bangladesh: The First Decade এবং ১৯৮১ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধে শহীদ জিয়ার রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। সংক্ষেপে তাঁর কথাগুলোর অনুবাদ করলে দাঁড়ায়—জিয়া চেয়েছিলেন তাঁর দেশের মানুষ বাংলাদেশী পরিচয়ে গর্বিত হোক, আত্মমর্যাদায় দৃঢ় হোক। তিনি চাইতেন জনগণ বিদেশী আধিপত্যের বিষয়ে সতর্ক থাকুক, নিজের শক্তিতে দাঁড়াতে শিখুক। ধর্মীয় বিশ্বাসে গর্ব থাকবে, কিন্তু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকারও সমানভাবে সংরক্ষিত হবে।
হয়তো শহীদ জিয়ার জীবদ্দশায় এই স্বপ্নগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু তিনি যে আদর্শের বীজ বপন করেছিলেন, তা আজও জাতি গঠনের পথ দেখায়। চার দশক পরও ইতিহাস তাঁর সত্যতা প্রমাণ করছে। শহীদ জিয়া বলতেন—“বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নাই।” এই একটি বাক্যই একটি জাতিকে আত্মমর্যাদায় উজ্জীবিত করার জন্য যথেষ্ট। কারণ আত্মমর্যাদাশীল জাতি কখনো দাসত্ব মেনে নেয় না।
আজ সময়ের দাবি—শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবন, দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা, রাজনীতি, অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে গভীর, নির্মোহ ও একাডেমিক গবেষণা। জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে এই গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত করা এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি ইতিহাসের কাছে আমাদের দায়।
লেখক : ট্রেজারার, অধ্যাপক ও গবেষক; বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
ডিরেক্টর (ফিন্যান্স), জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন।
আজকালের খবর/ এমকে