মঙ্গলবার ২০ জানুয়ারি ২০২৬
জাতীয় নির্বাচনে সহিংসতা প্রত্যাশিত নয়
সিরাজুল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:২৯ পিএম
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ ও প্রতীক্ষার পর এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশের মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার আলো জ্বলছে। স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতনের পর মানুষ আবার তাদের মৌলিক অধিকার- ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। অতীতে ভোট দিতে না পারার আফসোস, অধিকার বঞ্চনার কষ্ট এখনো মানুষের মনে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে। এই বাস্তবতায় নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, এটি জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তাই এই নির্বাচন যেন কোনোভাবেই সহিংসতায় কলুষিত না হয়- এটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভোটাধিকার হচ্ছে নাগরিকের সবচেয়ে মৌলিক ও প্রাথমিক অধিকার। মানুষ ভোটের মাধ্যমে শাসক নির্বাচন করে, রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। কিন্তু বিগত হাসিনা আমলে সেই অধিকার কার্যত কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। দিনের ভোট রাতে হওয়া, একতরফা নির্বাচন, বিরোধী মত দমন- এসব কারণে জনগণ ভোটের ওপর আস্থা হারিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা আজও মানুষ ভুলতে পারেনি। তাই ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তির পর মানুষ আবার চায় শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এই প্রক্রিয়ায় সহিংসতা হলে ভোটাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হবে, জনগণের আস্থা আবারও নষ্ট হবে। ভোটের অধিকার আদায়ের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে সহিংসতা মানে নিজের অর্জন নিজেই ধ্বংস করা। গণতন্ত্রের স্বার্থেই নির্বাচনকে রাখতে হবে একেবারেই শান্তিপূর্ণ।

এই নির্বাচন হচ্ছে দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর পর একটি বাস্তব অর্থে অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন। ফলে মানুষের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। এক সময় নির্বাচন মানেই ছিল গ্রাম-শহরে উৎসবের আমেজ- পোস্টার, মিছিল, আলোচনা, মানুষের হাসি। কথায় কথায় চায়ের কাপে রাজনীতির ঝড় তোলা। কিন্তু গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সেই চিত্র হারিয়ে গেছে। এখন মানুষ আবার সেই পুরোনো দিনের নির্বাচন ফিরে পেতে চায়। সহিংসতা, ভয়ভীতি, আতঙ্ক থাকলে নির্বাচন কখনো উৎসবমুখর হতে পারে না। বরং তা মানুষের মনে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে এই নির্বাচনকে আনন্দময় ও অংশগ্রহণমূলক রাখা, যাতে মানুষ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে এবং উৎসবের অনুভূতি ফিরে পায়।

নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য, বিরোধিতা ও প্রতিযোগিতা থাকবেই- এটা রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এই বিরোধিতা যেন কোনোভাবেই সংঘাত বা সহিংসতায় রূপ না নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। বক্তব্যে তীব্রতা আসছে, মাঠের রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়ছে। এই অবস্থায় সংযম হারালে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে। 

মনে রাখতে হবে, সহিংসতা কখনোই রাজনৈতিক লাভ এনে দেয় না; বরং পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। দায়িত্বশীল রাজনীতি মানে হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু তা হবে নীতির ভেতরে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে। মনে রাখতে হবে- আজ যে মানুষের বিরুদ্ধে সংঘাত, রাত পোহালে সেই-ই প্রতিবেশী। ফলে আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় সংঘাত-সহিংসতা একদমই গ্রহণযোগ্য নয়।

ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তির পর জনগণের চাওয়া-পাওয়া বাস্তবে রূপ দিতে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছে। এরইমধ্যে নির্বাচনের কয়েকটি ধাপ সফলভাবে অতিক্রান্ত হয়েছে। এটি জনগণের জন্য একটি বড় ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু যদি নির্বাচনকালে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সরকারের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সহিংসতা শুধু একটি দলের ক্ষতি করে না; এটি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর আঘাত হানে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দল- সবার সম্মিলিত দায়িত্ব হচ্ছে নির্বাচনকে সহিংসতামুক্ত রাখা, যাতে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ সফল হয় এবং জনগণের আস্থা আরো দৃঢ় হয়।

দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষ করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা এই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। তিনি সরাসরি দলের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিচ্ছেন যা রাজনৈতিক মাঠকে আরও প্রাণবন্ত করেছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই সমীকরণ বদলাচ্ছে, প্রতিযোগিতা বাড়ছে। কিন্তু এই নতুন বাস্তবতায় সহিংসতার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। এখানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো- রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বের দায়িত্বশীল ভূমিকা। শীর্ষ নেতারা যদি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক চর্চার বার্তা দেন, তাহলে কর্মীরাও তা অনুসরণ করবে। নেতৃত্বের একটিমাত্র ভুল বক্তব্যও মাঠে বড় সংঘাত তৈরি করতে পারে। তাই সব দল ও জোটের পক্ষ থেকে এই মুহূর্তে পরিণত ও দায়িত্বশীল রাজনীতি অত্যন্ত জরুরি।

নির্বাচনী সহিংসতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কখনোই রাজনৈতিক নেতা নন-ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ। দোকানপাট বন্ধ হয়, যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়, মানুষ আতঙ্কে থাকে। অনেক সময় নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়, আহত হয়। হতাহত ব্যক্তির পরিবার হয় অসহায়, নিঃস্ব। এসব ক্ষতি কোনো রাজনৈতিক হিসাবেই পুষিয়ে নেয়া যায় না। দীর্ঘদিন পর মানুষ যে আশায় ভোটাধিকার ফিরে পেতে চাইছে, সহিংসতা সেই আশাকেই ধ্বংস করে দেবে। তাই সহিংসতা মানে হচ্ছে জনগণের বিপক্ষে দাঁড়ানো। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এই বাস্তবতা অনুধাবন করা এবং জনগণের স্বার্থকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া।

এই নির্বাচন শুধু বর্তমানের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে- গণতন্ত্রের পথে, না আবার অস্থিরতার পথে- তা অনেকটাই নির্ভর করছে এই নির্বাচনের ওপর। যদি এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য ও সহিংসতামুক্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিশ্বাস করবে যে গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসা সম্ভব। আর যদি সহিংসতায় কলুষিত হয়, তাহলে সেই হতাশা আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে। তাই ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নির্বাচনে সহিংসতা কোনভাবেই কাম্য নয়- এটি এখন শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং জাতীয় প্রয়োজন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর পাওয়া এই সুযোগ যেন আমরা নিজেরাই নষ্ট না করি। প্রতিযোগিতা থাকবে, মতবিরোধ থাকবে, কিন্তু তা হবে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক। তবেই এই নির্বাচন সত্যিকার অর্থে জনগণের নির্বাচন হয়ে উঠবে।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আজকালের খবর/ এমকে








http://ajkalerkhobor.net/ad/1751440178.gif
সর্বশেষ সংবাদ
এ নির্বাচনে কোনো পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই: এনসিপির সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা
শাকসু নির্বাচন: জিএস পদে ছাত্রদলের ‘বিদ্রোহী’ আজীবন বহিষ্কার
সীতাকুণ্ডে সন্ত্রাসী হামলায় র‌্যাব সদস্য নিহত, গুলিবিদ্ধ আরও ৩
বাংলাদেশে অন অ্যারাইভাল ভিসা পুনরায় চালু
‘ধর্ম অবমাননা’ ও ‘আওয়ামী দোসর’ ট্যাগে ২ শিক্ষককে অব্যাহতি
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
চাঁদ দেখা যায়নি, শবেবরাত ৩ ফেব্রুয়ারি
শেখ হাসিনার আপিল শুনানির আগে পদত্যাগ করলেন টবি ক্যাডম্যান
প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ রুমিন ফারহানার
সেরা বিনোদন সাংবাদিকের পুরস্কার পেলেন মহিব আল হাসান
বাড্ডায় অটোরিকশা চালকদের সড়ক অবরোধ, ভোগান্তি
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft