
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার পথে বহু সংকট দেখা দিলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিতিশীলতা ছিল সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও সংবেদনশীল সমস্যাগুলোর একটি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পরিচয়, অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে যে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, তা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে এই সংকট আর কেবল স্থানীয় অসন্তোষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দক্ষিণ–পূর্ব সীমান্তে কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের স্বার্থে ভারতের ভূমিকা নিয়ে নানা অভিযোগ ও বিশ্লেষণ উঠে এসেছে, যা পার্বত্য সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
স্বাধীনতার পর থেকেই পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি অংশ নিজেদের “আদিবাসী” পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা রাষ্ট্র বা বিস্তৃত স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলে। ১৯৭০ ও ৮০–এর দশকে তারা সংগঠিতভাবে অস্ত্র সংগ্রহ করে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে অভিযোগ করা হয়েছে, ভারত এসব গোষ্ঠীকে অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের ওপর কৌশলগত চাপ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশকে বারবার কঠোর সামরিক ও নিরাপত্তা অভিযানে যেতে হয়েছে, যেখানে সেনা, পুলিশ ও বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা প্রাণ হারিয়েছেন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভয়, অনিশ্চয়তা ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে জীবনযাপন করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আলোচনার পথে অগ্রসর হয় এবং তারই ফল হিসেবে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয় পার্বত্য শান্তি চুক্তি। এই চুক্তিকে সে সময় একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল অস্ত্রবিরতি, স্থায়ী শান্তি, আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। তবে প্রায় তিন দশক পর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠেছে—এই চুক্তি বাস্তবে কতটা সফল হয়েছে, এবং বাংলাদেশ আসলে কী অর্জন করেছে?
চুক্তিতে প্রায় ৭০টি ধারা অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেখানে বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামো, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কমিশন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণ, সেনা ক্যাম্প কমানো এবং পাহাড়ি–বাঙালিদের সমঅধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিশ্রুতির বড় অংশই পূরণ হয়নি। ভূমি কমিশন কার্যত অকার্যকর রয়ে গেছে, প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকাংশ বিষয় কাগজেই সীমাবদ্ধ, আর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ তো দূরের কথা—বরং নতুন নতুন গ্রুপের জন্ম হয়েছে। গত এক দশকে চাঁদাবাজি, অপহরণ, অস্ত্র পাচার ও বাঙালি–পাহাড়ি উত্তেজনা আবারও বেড়েছে, যা প্রমাণ করে যে চুক্তি স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারেনি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যু ভারত দীর্ঘদিন ধরে একটি “স্ট্র্যাটেজিক লেভারেজ” হিসেবে ব্যবহার করেছে। চট্টগ্রাম বন্দর, কক্সবাজার উপকূল, উত্তর–পূর্ব ভারতের যোগাযোগ করিডোর এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে এই অঞ্চলের গুরুত্ব গভীরভাবে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, আজও কিছু সশস্ত্র পাহাড়ি গোষ্ঠী ভারতের ভেতরে আশ্রয় ও সহায়তা পায়, যা চুক্তি বাস্তবায়নের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চুক্তির অন্যতম বিতর্কিত বিষয় ছিল সেনা উপস্থিতি কমানো। ধারণা ছিল, এতে আস্থা বাড়বে এবং স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি সামলাতে সক্ষম হবে। কিন্তু বাস্তবে সেনা ক্যাম্প কমার সঙ্গে সঙ্গে অনেক এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বেড়ে যায়। চাঁদাবাজি ও অপহরণের মতো অপরাধ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে। স্থানীয় প্রশাসন এই নিরাপত্তা শূন্যতা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আজ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় জনগণের একটি বড় অংশ মনে করে, পাহাড়ে শক্তিশালী সেনা উপস্থিতি ছাড়া আইন–শৃঙ্খলা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা সম্ভব নয়।
চুক্তির পর পাহাড়ি জনগোষ্ঠী দেশের মূলধারার সঙ্গে আরও সম্পৃক্ত হবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। একটি অংশ এখনো নিজেদের আলাদা জাতিগত সত্তা হিসেবে তুলে ধরে, সংবিধান মেনে নিতে অনাগ্রহ দেখায় এবং কিছু এলাকায় বাঙালিদের প্রতি বৈরী মনোভাব বজায় রয়েছে। হামলা, উচ্ছেদ ও হুমকির ঘটনাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এতে স্পষ্ট হয়, চুক্তি কাঙ্ক্ষিত আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রায় ২৮ বছর পর বাংলাদেশের প্রাপ্তি সীমিত—কিছু উন্নয়ন প্রকল্প ও রাজনৈতিক প্রচারণা থাকলেও পাহাড় এখনো অস্থির ও দুর্বল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থানই প্রমাণ করে যে সমস্যার মূল জায়গাগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তাই এখন প্রয়োজন নতুন ও বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি—পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তা উপস্থিতি জোরদার করা, বিদেশি প্রভাব বন্ধ করা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, ভূমি কমিশন কার্যকর করা এবং বাঙালি–পাহাড়ি বৈষম্য দূর করতে আন্তরিক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।
একসময় যে শান্তি চুক্তিকে “ঐতিহাসিক সাফল্য” বলা হয়েছিল, আজ বাস্তবতা বলছে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে। প্রশ্ন তাই আরও জোরালো—চুক্তি কি সত্যিই শান্তি এনেছে, নাকি শান্তির নামে আমরা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতাকেই প্রশ্রয় দিয়েছি? রাষ্ট্রের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডেও অশান্তি মেনে নেওয়া যায় না। চুক্তি থাকুক বা না থাকুক, পাহাড়ে দৃঢ় রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি, কারণ সার্বভৌমত্বই শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ নিরাপত্তা।
লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আজকালের খবর/বিএস