
আধুনিক ইতিহাসে চীনের উন্নয়ন বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বিস্ময়কর উদাহরণগুলোর একটি। মাত্র কয়েক দশকে বিশেষ করে গত ২৫ বছরে—চীন পরিণত হয়েছে অবকাঠামো, শিল্প, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, নগরায়ন ও ডিজিটাল অর্থনীতির এক বৈশ্বিক শক্তিতে।
ছোট শহরেও বিশ্বমানের বিমানবন্দর, দ্রুতগতির রেললাইন, প্রশস্ত সড়ক, পরিকল্পিত আবাসন, শিল্প পার্ক, আধুনিক শপিং মল সবকিছুই চীনের বাস্তবতা।
পশ্চিমা বিশ্লেষণে প্রায়ই বলা হয়: চীন দ্রুত উন্নতি করেছে কারণ সেখানে গণতন্ত্র নেই। এই ব্যাখ্যাটি সহজ, কিন্তু ভুল। প্রকৃত কারণ লুকিয়ে আছে দৃষ্টি, শাসনব্যবস্থা, বাস্তবায়ন দক্ষতা এবং উন্নয়নের সঠিক ক্রমে।
পিছিয়ে থাকা অবস্থান থেকেই যাত্রা১৯৭৮ সালে চীনের মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ১০০ ডলার। পরিবহন মানেই সাইকেল। আধুনিক ব্যাংকিং, ব্যক্তিমালিকানা বা বৈদেশিক বিনিয়োগ কিছুই ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে তখন চীন বাংলাদেশ ও ভারতের চেয়েও পিছিয়ে ছিল।
অর্থাৎ চীন কোনো সুবিধাজনক অবস্থান থেকে যাত্রা শুরু করেনি। পার্থক্য ছিল স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণে।
আদর্শের আগে দৃষ্টিচীন প্রথমে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিল: একটি জাতি কীভাবে ধনী ও শক্তিশালী হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পরই তারা রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসন সাজিয়েছে।
দেং শিয়াওপিংয়ের বিখ্যাত উক্তি
“বিড়াল কালো না সাদা, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো সে ইঁদুর ধরতে পারে কিনা।”
ফলাফলই ছিল মুখ্য, মতাদর্শ নয়।
বাংলাদেশ ও ভারতে উল্টোটা হয়েছে প্রথমে আদর্শ নিয়ে বিতর্ক, পরে উন্নয়ন। ফলে সিদ্ধান্তহীনতা ও ধীরগতি।
KPI-ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা
চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পারফরম্যান্সভিত্তিক প্রশাসন। কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন হয়
• জিডিপি বৃদ্ধি
• বিনিয়োগ আকর্ষণ
• কর্মসংস্থান
• অবকাঠামো বাস্তবায়ন
মেয়ররা কার্যত তাদের শহরের CEO। প্রতিযোগিতা চলে কে বেশি উন্নয়ন দেখাতে পারে। তাই ছোট শহরেও আধুনিক অবকাঠামো।
দক্ষিণ এশিয়ায় এমন পরিমাপযোগ্য জবাবদিহিতা দুর্বল।
অবকাঠামো আগে, চাহিদা পরে
চীন অবকাঠামো তৈরি করে চাহিদা সৃষ্টি করে।
পশ্চিমা মডেলে আগে চাহিদা, পরে অবকাঠামো।
চীনের কাছে অবকাঠামো ব্যয় নয় উৎপাদনশীল পুঁজি।
বাংলাদেশ ও ভারত সাধারণত সংকটের পরে ব্যবস্থা নেয়—যখন খরচ বেশি, সুযোগ কম।
উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যাংক
চীনের ব্যাংকগুলো জাতীয় উন্নয়নের অংশ। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে অর্থায়ন করে, ধৈর্য ধরে। ক্ষতি হলেও উন্নয়ন থামে না।
অন্যদিকে আমাদের অঞ্চলে ব্যাংক হয় অতিরিক্ত ভীত, নয়তো দিকনির্দেশনাহীন।
পশ্চিমা মডেল: সহায়ক না বাধা?
বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য পশ্চিমা উন্নয়ন মডেল প্রায়ই বাধা হয়ে দাঁড়ায়—অতিরিক্ত মামলা, জটিলতা, দাতানির্ভরতা ও সিদ্ধান্ত বিলম্ব।
চীন প্রযুক্তি নিয়েছে, কিন্তু পশ্চিমা উন্নয়ন ক্রম মানেনি।
গণতন্ত্র বনাম শাসনক্ষমতা
সমস্যা গণতন্ত্র নয়।
সমস্যা হলো কার্যকর শাসনব্যবস্থার অভাব।
চীনে গণতন্ত্র নেই, কিন্তু শাসন আছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভোট আছে, কিন্তু শাসন দুর্বল।
চীন সফল হয়েছে কারণ তারা
• উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে
• স্পষ্ট দৃষ্টি নির্ধারণ করেছে
• KPI দিয়ে শাসন চালিয়েছে
• অবকাঠামো ও শিল্পে বিনিয়োগ করেছে
• পশ্চিমা চাপ উপেক্ষা করার সাহস দেখিয়েছে
চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নকল করা দরকার নেই।
কিন্তু তাদের দৃষ্টি, শাসন কাঠামো ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি থেকে শেখা জরুরি।
উন্নয়ন কোনো স্লোগান নয় এটি দৃষ্টি, শৃঙ্খলা ও বাস্তবায়নের ফল।
আজকালের খবর/ এমকে