রবিবার ২৬ জুলাই ২০২৬
বন্দর ইজারা: আধুনিকায়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সমীকরণ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:২৮ পিএম   (ভিজিট : ১৪৪৭)
২০২৬ সালের এই প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এক অনন্য এবং চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। গ্লোবাল লজিস্টিকস ইনডেক্সে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করা এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চাপ সামলানো এখন আর কেবল বিলাসী পরিকল্পনা নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের লড়াই। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধানতম ধমনী এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণকারী চট্টগ্রাম বন্দর আজ এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে। গত কয়েক দশকের কাঠামোগত স্থবিরতা এবং সনাতন পদ্ধতির বেড়াজাল ভেঙে আমরা যখন বিশ্বমানের প্রযুক্তির দিকে হাত বাড়াচ্ছি, তখন আমাদের সামনে বড় প্রশ্নটি হলো—এই অগ্রযাত্রা কি আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করছে? 

সার্বভৌমত্ব কেবল একটি ভৌগোলিক শব্দ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতার প্রতিফলন। আমার পূর্বের বিশ্লেষণগুলোতেও আমি বারবার বলেছি, চট্টগ্রাম বন্দর কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গত ১১ জানুয়ারি কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে যে "বন্দরকেন্দ্রিক বিনিয়োগ বাড়লে গতিশীল হবে অর্থনীতি" বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, তার সাথে আমার মূল পর্যবেক্ষণ হলো—অর্থনৈতিক গতিশীলতা অবশ্যই কাম্য, তবে তা হতে হবে জাতীয় নিরাপত্তার বর্ম অক্ষুণ্ণ রেখে।

দক্ষিণ এশিয়ায় নৌ-বাণিজ্যের আধিপত্য বিস্তারে কলম্বো, সিঙ্গাপুর এবং বর্তমানে ভারতের জওহরলাল নেহরু (JNPT) বা মুন্দ্রা বন্দর আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। পরিসংখ্যান বলছে, সিঙ্গাপুর বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বছরে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন টিইইউস (TEUs), যেখানে চট্টগ্রাম বন্দর এখনো ৩ থেকে ৩.৫ মিলিয়ন টিইইউস-এর বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দর কেবল ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দিয়ে তাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। কলম্বোর ‘টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম’ যেখানে ১ দিনের নিচে, সেখানে চট্টগ্রামে বড় জাহাজের জন্য আমাদের ২ থেকে ৪ দিন অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়ক্ষেপণ মানেই পণ্যের আমদানি-রপ্তানি খরচ বৃদ্ধি।

যদি আমরা আঞ্চলিক হাব হতে চাই, তবে আমাদের বে-টার্মিনাল এবং লালদিয়া টার্মিনালকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন মাদার ভেসেলগুলো সরাসরি ভিড়তে পারে। বর্তমানে ড্রাফট সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা ফিডার ভেসেলের ওপর নির্ভরশীল। বিদেশি অপারেটর নিয়োগের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় যুক্তি যে, তারা তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বড় শিপিং লাইনগুলোকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসবে। তবে মনে রাখতে হবে, শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের গয়াদর বন্দরের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে, কৌশলগত সম্পদ ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি ফাঁকফোকর থাকলে তা ঋণের ফাঁদে (Debt Trap) রূপ নিতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে যে বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা আমাদের জাতীয় সক্ষমতার এক নতুন পরীক্ষা। ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৬,৭০০ কোটি টাকার এই ইউরোপীয় বিনিয়োগ বাংলাদেশের বন্দর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত বৃহত্তম। আমরা আধুনিকায়ন চাই, যেখানে এআই-চালিত লজিস্টিকস, অটোমেশন এবং পেপারলেস ক্লিয়ারেন্স থাকবে, কিন্তু সেই প্রযুক্তির মূল ‘চাবিকাঠি’ থাকতে হবে আমাদের নিজস্ব বিশেষজ্ঞদের হাতে। 

২৭ ডিসেম্বর দৈনিক কালেকণ্ঠে প্রকাশিত আমার “চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা : অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ”  প্রবন্ধে যে শঙ্কার কথা বলেছি, তা হলো—বিদেশি বিনিয়োগ যেন কোনোভাবেই ‘উপহার’ বা ‘নামমাত্র মূল্যে’ জাতীয় সম্পদ তুলে দেওয়ার নামান্তর না হয়। চুক্তির খুঁটিনাটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি একটি ৩০ বছরের কনসেশন চুক্তি। এখানে সার্বভৌমত্ব বনাম পরিচালনার দ্বন্দ্বে আমাদের অবস্থান হতে হবে আপসহীন। চুক্তির সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হলো—টার্মিনালটির পূর্ণ মালিকানা থাকবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই। বিদেশি কোম্পানিগুলো কেবল ‘অপারেটর’ হিসেবে সেবা দেবে। মালিকানা এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদি সামান্যতম ছাড় দেয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা আমাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে বঙ্গোপসাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত অঞ্চল। এখানে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য। কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে 'মাল্টি-অপারেটর' মডেলের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হলে জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত হয়। নেপাল, ভুটান ও উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরকে রিজিওনাল হাব হিসেবে গড়ে তোলার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন আমাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয় এবং রাষ্ট্র যেন যথাযথ ট্রানজিট ফি পায়। বিনিয়োগের অংকের চেয়েও বড় বিষয় হলো—আমাদের বন্দরের ওপর দিয়ে কোন দেশের পণ্য যাচ্ছে এবং তাতে আমাদের দেশীয় নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি আছে কি না, তা যাচাই করার সার্বভৌম ক্ষমতা যেন বিদেশের অপারেটরের হাতে না যায়। চুক্তিতে এমন কোনো 'এস্কেপ ক্লজ' থাকা চলবে না যা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আদালতে বা আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে দেয়।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে আমরা যখন ‘স্মার্ট পোর্ট’ গড়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে যে প্রযুক্তি কেবল কর্মক্ষমতাই বাড়ায় না, এটি ডাটাসিকিউরিটির ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বন্দরের সমস্ত ডাটা এবং ক্লিয়ারেন্স সিস্টেম যাতে আমাদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। বিদেশি অপারেটররা তাদের প্রযুক্তি নিয়ে আসবে, কিন্তু সেই সিস্টেমের তদারকি করার জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন ‘রেগুলেটরি বডি’ থাকা আবশ্যক। এছাড়া আধুনিকায়নের সুফল যেন কেবল বড় বিনিয়োগকারীদের পকেটে না যায়, বরং আমাদের সাধারণ শ্রমিক শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছায়। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে যেন হাজার হাজার বন্দর শ্রমিক কর্মহীন না হয়, বরং বিদেশি কোম্পানিগুলোকে চুক্তির মাধ্যমে বাধ্য করতে হবে যেন তারা স্থানীয় জনবলকে উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ করে গড়ে তোলে। দক্ষ জনবলই হবে আমাদের অর্থনীতির স্থায়ী সম্পদ।

জাতীয় অর্থনৈতিক সম্পদ রক্ষায় বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী পর্যবেক্ষণ হলো—রাজনৈতিক অভিন্ন ঐকমত্য। বন্দর এবং বন্দরগামী মহাসড়কগুলোকে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি, হরতাল বা অবরোধের ঊর্ধ্বে রাখা এখন সময়ের দাবি। বন্দর একদিন বন্ধ থাকা মানে হাজার কোটি টাকার জাতীয় ক্ষতি। এটি কেবল ব্যবসায়ীদের ক্ষতি নয়, এটি সাধারণ মানুষের পকেট কাটার নামান্তর। দেশের সকল রাজনৈতিক দলের উচিত একটি জাতীয় সনদ বা ঐকমত্যে পৌঁছানো যে, ক্ষমতা বা রাজনীতির দ্বন্দ্বে অর্থনৈতিক লাইফলাইনগুলোকে কখনো বাধাগ্রস্ত করা হবে না। 

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির যে গণভোট ও নির্বাচন নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা চলছে, সেখানেও মানুষের প্রত্যাশা হলো—একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক কাঠামো যা আমাদের এই বিনিয়োগ ও আধুনিকায়নের সুফলগুলো ঘরে তুলতে সাহায্য করবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাংবিধানিক ভারসাম্য ছাড়া ‘ভবিষ্যৎ অর্থনীতি’র কোনো স্বপ্নই সফল হওয়া সম্ভব নয়।

পরিশেষে বলা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নের পদক্ষেপটি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। তবে এই যাত্রায় আমাদের পথ হবে সতর্কতার। সার্বভৌমত্ব কেবল আমাদের গর্ব নয়, এটি আমাদের টিকে থাকার ভিত্তি। আমরা বিশ্বের জন্য বন্দরের দুয়ার খুলে দেব ঠিকই, কিন্তু সেই ঘরের নিয়ন্ত্রণ থাকবে আমাদের হাতেই। বিদেশি অপারেটরের নিয়োগ কেবল একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি কৌশলগত চুক্তি। সরকার যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রতিটি দিক নিশ্চিত করে এই আধুনিকায়ন সম্পন্ন করতে পারে, তবেই চট্টগ্রাম বন্দর হবে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির মহাতীর্থ। মনে রাখতে হবে, আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি এবং জাতীয় আত্মমর্যাদা সমান্তরালে চলবে। এই ভারসাম্য রক্ষাই হবে আগামী দিনের সার্থক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্বের আসল পরিচয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আজকালের খবর/ এমকে









Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft