সোমবার ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
জাতীয় নির্বাচন: আওয়ামী ভোটারদের টানতে মরিয়া সব দল
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ: শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:৪৪ পিএম
গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হারানোর পর রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এখন এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি। দলটি নিষিদ্ধ। শীর্ষ নেতৃত্ব পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত। অনেকেই কারাগারে। সুতরাং নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ আপাতত নেই বলেই মনে হচ্ছে। অথচ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে সেই আওয়ামী লীগই—ভিন্ন এক রূপে। দল নয় বরং দলটির ভোটাররা এখন হয়ে উঠেছেন সবচেয়ে কাঙ্খিত রাজনৈতিক সম্পদ।

দেশের প্রায় সব সক্রিয় রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে নির্বাচনের বাইরে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই প্রশ্নে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রায় সর্বজনীন। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও তাদের সমর্থক-ভোটারদের পক্ষে টানতে নীরব প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ প্রায় সব প্রতিদ্বন্দ্বী দল। ফলে নির্বাচনী মাঠে এক অদ্ভুত দ্বৈততা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ সবাই আওয়ামী লীগের বিপক্ষে অবস্থান নিলেও তাদের ভোটারদের কাছে টানতে মরিয়া ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে সকলের মধ্যে। 
ব্যাপারটা এমন যে, গাছটা ভালো নয়। কিন্তু ফলটা খেতে মজা!

দেশের নির্বাচনব্যবস্থার ইতিহাস বলছে, ভোটের রাজনীতিতে সংখ্যা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। আদর্শ, মূল্যবোধ কিংবা নৈতিক অবস্থান প্রায়ই বাস্তব রাজনীতির কাছে গৌণ হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের ভোটারদের ঘিরে বর্তমান টানাটানিও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। 

১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮—এই চারটি নির্বাচনকে সাধারণভাবে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে ধরা হয়। এই চার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল যথাক্রমে ৩০ দশমিক শূন্য ৮, ৩৭ দশমিক ৪৪, ৪০ দশমিক ১৩ এবং ৪৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভোটভিত্তি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছিল। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে হলেও সেগুলো ছিল চরম বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে প্রকৃত ভোটের হিসাব সেখানে অস্পষ্ট।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তন আসে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়। সভাপতি শেখ হাসিনা ও শীর্ষ নেতারা পলাতক কিংবা কারাবন্দী হন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে রায় ঘোষিত হয়। এসব ঘটনার পর আওয়ামী লীগের প্রকৃত জনসমর্থন এখন কত, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

আওয়ামী লীগের ভোট নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় সমাজ, প্রশাসন, পেশাজীবী মহল ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভেতরে দলটির যে নীরব সমর্থক গোষ্ঠী রয়ে গেছে তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এই নীরব ভোটাররাই এখন নির্বাচনী অঙ্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আসনভিত্তিকভাবে আওয়ামী লীগের ভোট টানার জন্য নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। কোথাও আওয়ামী লীগ নেতাদের দলে ভেড়ানো হচ্ছে। কোথাও মামলা থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। কোথাও আবার সামাজিক মিটমাটের নামে পুরোনো দ্বন্দ্ব ভুলে যাওয়ার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপি মনে করছে, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি বড় অংশ দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ। তাদের কাছে বিএনপি নিজেকে বিকল্প শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। বিএনপির নেতারা বলছেন, গ্রামীণ পর্যায়ে ইতিমধ্যে সামাজিক পুনর্মিলন ঘটেছে। শহরে এই প্রক্রিয়া তুলনামূলক ধীর হলেও নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে দল-মতনির্বিশেষে সবাই ভোটের রাজনীতিতে ফিরছে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী আরও স্পষ্ট কৌশলে এগোচ্ছে। অতীতে যাদের তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেছে, সেই আওয়ামী লীগ সমর্থকদেরও আশ্রয় দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। কোনো কোনো জামায়াত নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন, আওয়ামী লীগ থেকে জামায়াতে যোগ দিলে সব দায়দায়িত্ব তারা নেবেন। এমন বক্তব্য রাজনীতিতে নজিরবিহীন না হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে—‘যে নির্বাচনে নৌকা নেই, সে নির্বাচনে ভোট নয়’। ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। ফলে দলের একাংশ কর্মী-সমর্থক ভোট বর্জন করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের সব ভোটার এক সিদ্ধান্তে চলবেন—এমন সম্ভাবনা কম। বাংলাদেশের ভোটাররা দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থী, স্থানীয় সম্পর্ক ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেন। ফলে আওয়ামী লীগের একটি অংশ ভোট দিতে না গেলেও আরেক অংশ নীরবে ভোট প্রয়োগ করতে পারেন।


অপরদিকে গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের হাত ধরে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির প্রতি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ক্ষোভ সবচেয়ে বেশি। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার আন্দোলনে এনসিপির সক্রিয় ভূমিকা সেই ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।

এনসিপির নেতারা বলছেন, ভোট আকৃষ্ট করার নামে অপরাধীদের দায়মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে তা গণহত্যার নৈতিক বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। তাদের মতে কাজের মাধ্যমে ভোট আকৃষ্ট করাই হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ। অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে ভোট টানার চেষ্টা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বড় অংশ আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। এবার সেই সমীকরণ ভাঙতে মরিয়া বিএনপি ও জামায়াত। দুই দলই হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে সংখ্যালঘু ভোট টানার কৌশল নিয়েছে।

জামায়াতের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় পরিবর্তন। অতীতে দলটিতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের দৃশ্যমান অংশগ্রহণ ছিল না। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর সংখ্যালঘুদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি গঠন ও প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। খুলনা, কিশোরগঞ্জ, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন আসনে এই কৌশল স্পষ্ট।

বিএনপিও একই পথে হাঁটছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এমন একাধিক সংখ্যালঘু নেতাকে প্রার্থী করেছে দলটি। এতে দলের ভেতরে সমালোচনা থাকলেও নির্বাচনী বাস্তবতায় বিএনপি এই ঝুঁকি নিচ্ছে।


ইতিহাস বলছে, ভোট নিয়ে এই টানাটানি নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর মুসলিম লীগের পতনের পর তাদের ভোট টানার চেষ্টা হয়েছিল। এরশাদের পতনের পর জাতীয় পার্টির ভোট নিয়ে একই ধরনের রাজনীতি দেখা গেছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলো শেষ পর্যন্ত সংখ্যার হিসাবই করে। মূল্যবোধের প্রশ্ন সেখানে প্রায়ই গৌণ হয়ে যায়।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে যে, ভোটের জন্য কতটা ছাড় দেওয়া উচিত। অপরাধ, দায়মুক্তি ও নৈতিকতার প্রশ্ন উপেক্ষা করে ভোট টানার রাজনীতি কি ভবিষ্যতের গণতন্ত্রকে আরও দুর্বল করবে না?

আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিষিদ্ধ ও দুর্বল। কিন্তু তাদের ভোটাররা এখনো রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। এই ভোটারদের নিয়ে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে—বিশেষ করে যেসব আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান কম।
এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির নৈতিক দিকনির্দেশনারও পরীক্ষা। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলো এখন আদর্শ ও জবাবদিহির পথে এগোবে, নাকি কেবল ক্ষমতার প্রশ্নে যে কোনো আপসকামিতাকেই বেছে নেবে। সেটাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।

আজকালের খবর/ এমকে








http://ajkalerkhobor.net/ad/1751440178.gif
সর্বশেষ সংবাদ
যমুনায় যাচ্ছেন এনসিপি নেতারা
আমিরাতে শাবানের চাঁদ দেখা গেছে, রমজানের দিন গণনা শুরু
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বিতীয় রোডম্যাপ প্রকাশ
এস আলম ও পিকে হালদারসহ ১৩ জনের বিচার শুরু
কুমিল্লা-৩ আসনে কায়কোবাদের প্রার্থিতা বহাল
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সাতক্ষীরার সাংবাদিকদের সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান পিআইবি মহাপরিচালকের
দ্বৈত নাগরিকত্ব : ইসির নমনীয়তায় সুখবর পেলেন ২০ প্রার্থী
চীনের সম্মতি পেলেই শুরু হবে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ: সৈয়দা রিজওয়ানা
ব্যালট পেপার ও কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে শঙ্কা: ইসি ভবন ঘেরাও ছাত্রদলের
‘নতুন অন্তর্বর্তী সরকার এলে ভোটে যেতে প্রস্তুত আওয়ামী লীগ’
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft