গণতন্ত্রের মূল শক্তি মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। ভিন্নমত থাকবে, বিতর্ক হবে, ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটবে ভোটের মাধ্যমে—এটাই গণতান্ত্রিক রীতির স্বাভাবিক ধারা। কিন্তু যখন মতপ্রকাশের জায়গা দখল করে নেয় ভয়, হুমকি ও সংঘবদ্ধ উচ্ছৃঙ্খলতা, তখন গণতন্ত্র নিজেই সংকটে পড়ে। আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেই সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে মবতন্ত্র।
মবতন্ত্র মানে শুধু রাস্তায় ভাঙচুর বা সহিংসতা নয়। মবতন্ত্র হলো আইন ও বিচারব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে দলবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া। এটি বিচারকের রায়ের আগেই শাস্তি কার্যকর করার প্রবণতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপরাধী বানিয়ে জনতাকে উত্তেজিত করে রাস্তায় নামিয়ে আনা—এও মবতন্ত্রেরই অংশ। এই প্রবণতা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির জন্যও মারাত্মক হুমকি।
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মবতন্ত্র এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে ব্যক্তির যুক্তিবোধ লুপ্ত হয়ে যায় এবং দলগত আবেগ প্রাধান্য পায়। মানুষ তখন নিজের বিবেক দিয়ে নয়, ভিড়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এই ভিড় কখনো ধর্মের নামে, কখনো জাতীয়তাবাদের নামে, আবার কখনো ন্যায়ের দাবিতে সংগঠিত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর পরিণতি হয় হতাশাজনক—আইন দুর্বল হয়, প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে, সমাজে অনাস্থা বাড়ে।
বিশ্বখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ ল্য বঁ তার The Crowd গ্রন্থে লিখেছিলেন, ‘একটি ভিড় কখনো যুক্তিবাদী হয় না; ভিড় আবেগ দ্বারা চালিত হয়।’ এই কথার বাস্তব প্রমাণ আজ বাংলাদেশের সমাজে প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে। একটি গুজব, একটি অসম্পূর্ণ ভিডিও কিংবা বিভ্রান্তিকর খবর মুহূর্তের মধ্যে সহিংস ভিড় তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে। এরপর শুরু হয় বাড়িঘর ভাঙচুর, মানুষকে মারধর, এমনকি হত্যাকাণ্ড।
বাংলাদেশে মবতন্ত্র নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে এর বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গ্রাম কিংবা শহর—ধর্মীয় ইস্যু, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব—সব ক্ষেত্রেই মবতন্ত্রের উপস্থিতি চোখে পড়ছে। চুরির অভিযোগে গণপিটুনি দিয়ে পরে জানা যাচ্ছে অভিযোগটি ছিল ভিত্তিহীন। কখনো ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পুরো এলাকা উত্তপ্ত করা হচ্ছে, প্রশাসন পৌঁছানোর আগেই ঘটে যাচ্ছে অপূরণীয় ক্ষতি। আবার কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করা হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক সময় এই মবতন্ত্র নীরব সামাজিক প্রশ্রয় পায়। কেউ কেউ বলে থাকেন, ‘ও তো খারাপ লোক ছিল।’ এই মানসিকতাই মবতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হলো আইনের শাসন। আইন সবার জন্য সমান, আর অপরাধের বিচার হবে আদালতে। কিন্তু মবতন্ত্র এই ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। মব বলে—আদালতের দরকার নেই, প্রমাণের প্রয়োজন নেই, আমরা নিজেরাই বিচার করব।
দার্শনিক হান্না আরেন্ট বলেছিলেন, ‘যখন আইন ভেঙে পড়ে, তখন সহিংসতা নিজেকে ন্যায়ের রূপে উপস্থাপন করতে চায়।’ বাংলাদেশে আজ ঠিক সেটাই ঘটছে। সহিংসতাকে ‘জনতার ক্ষোভ’ বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ক্ষোভ কখনোই আইন হতে পারে না।
ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করেছে—এটি সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে এগুলো মবতন্ত্রের জ্বালানি হিসেবেও কাজ করছে। প্রবাসী কিছু ইউটিউবারের উসকানিতে দেশে একাধিক সহিংস ঘটনার উদাহরণ রয়েছে। বিশেষ করে গণমাধ্যমে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তাদের উসকানি বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। একটি গুজব পোস্ট কিংবা উসকানিমূলক লাইভ ভিডিও মুহূর্তেই হাজারো মানুষকে উত্তেজিত করে তুলতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানী ম্যানুয়েল কাস্তেলস যথার্থই বলেছেন, ‘নেটওয়ার্ক সমাজে ক্ষমতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু দায়িত্ববোধ ছড়িয়ে পড়ে না।’ এই দায়িত্বহীনতাই মূল সমস্যা। মানুষ শেয়ার করে, লাইক দেয়, উত্তেজনা বাড়ায়—কিন্তু পরিণতির দায় নেয় না।
রাজনীতিতেও মবতন্ত্র একটি বিপজ্জনক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনতা জড়ো করা, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে জনতার ক্ষোভ ব্যবহার করা নতুন কিছু নয়। তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি দুর্বল হলে মবতন্ত্রই হয়ে ওঠে সহজ পথ। এতে রাজনীতি আরও সহিংস হয়, নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়।
মবতন্ত্র মোকাবিলায় রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে মব আরও সাহস পায়। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের দেরি কিংবা রাজনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন বৈধ সহিংসতার একচেটিয়া অধিকারী হিসেবে। এই অধিকার যখন ভিড়ের হাতে চলে যায়, তখন রাষ্ট্র নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
মবতন্ত্র কেবল আইনগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর নৈতিক সংকটও। আমরা কি আমাদের সন্তানদের নাগরিক দায়িত্ব ও নৈতিকতা শেখাতে পারছি? শিক্ষাব্যবস্থায় নাগরিক শিক্ষা দুর্বল হলে মানুষ সহজেই ভিড়ের অংশ হয়ে যায়। ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তি নিজের দায়বদ্ধতা ভুলে যায়—এই মানসিকতা বদলানো জরুরি।
বিশ্বের অনেক দেশ মবতন্ত্রের অভিজ্ঞতা মোকাবিলা করেছে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসনের মাধ্যমে। ভারতে গণপিটুনির বিরুদ্ধে কঠোর আইন করা হয়েছে, ইউরোপে ঘৃণাভাষণের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশও পারবে—যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সাহস থাকে।
মব নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগে শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে। পরিচয়, দল কিংবা ধর্ম নির্বিশেষে মবতন্ত্রে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, তবে তা যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব না করে। পাশাপাশি শিক্ষা ও গণমাধ্যমকে মানুষকে বোঝাতে হবে—মব কোনো ন্যায়ের প্রতীক নয়, বরং একটি ঘৃণ্য অপরাধ।
গণতন্ত্র নিখুঁত নয়, তবু এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে মবতন্ত্রকে থামাতেই হবে। ভিড়ের শাসন কোনো সমাজকে নিরাপদ করে না; বরং সবাইকে অনিরাপদ করে তোলে। তাই এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—আমরা কি আইন ও বিবেকের পথে হাঁটব, নাকি আবেগ ও ভিড়ের হাতে নিজেদের ভবিষ্যৎ তুলে দেব?
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আজকালের খবর/ এমকে