সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে এখন শুধু পানির উত্তাল ঢেউ, ভেসে যাওয়া ধানের শীষ আর কৃষকের অসহায় আর্তনাদ। প্রকৃতির এক নির্মম পরিহাসে আজ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে দেশের খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এই জনপদ। যেখানে কয়েক দিন আগেও বাতাসের দোলায় সোনালি ফসলের সমুদ্র দুলত, সেখানে আজ শুধু অথৈ জলরাশি আর কৃষকের লালিত স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপ। প্রতি বছরের মতো এবারও অকাল বন্যা আর পাহাড়ি ঢল এক নিষ্ঠুর নিয়তি হয়ে আছড়ে পড়েছে হাওরবাসীর জীবনে। মেঘালয় আর চেরাপুঞ্জির সেই অঝোর ধারা যেন বিষাদ সিন্ধু হয়ে নেমে এসেছে বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলে।
যে ফসলের ওপর সারা বছরের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা আর সন্তানের শিক্ষা নির্ভর করত, সেই সোনালি ধান এখন পানির নিচে নিঃশব্দে পচে যাচ্ছে। এই দৃশ্য কেবল একজন কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং এটি একটি জাতীয় হাহাকার। এই চরম সংকটে আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলে উঠেছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক বলিষ্ঠ ঘোষণা। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি যখন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করলেন এবং আগামী তিন মাস বিশেষ সরকারি সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিলেন, তখন হাওরের লোনা জলে ভেজা চোখে কিছুটা হলেও স্বস্তির আভা দেখা গেছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে কৃষকরা দেশের অন্নদাতা এবং তাদের দুর্দশা সরকারেরও দুর্দশা। এই ঘোষণা কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার সন্তানদের প্রতি এক পরম মমত্বের বহিঃপ্রকাশ।
সুনামগঞ্জ জেলার চিত্রটি কল্পনা করলেও গা শিউরে ওঠে। ১৩৭টি বিশাল হাওরের বুক চিরে গড়ে ওঠা এই জনপদে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১৪ লাখ টন ধান। কিন্তু প্রকৃতির রুদ্ররোষে ইতোমধ্যে প্রায় ৫,৫০০ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। সুনামগঞ্জের দেখার হাওর, করচার হাওর, তাঙ্গুয়া, খাই ও পাখিমারা হাওরের বাঁধগুলো যখন এক এক করে ভেঙে পড়ছিল, তখন কৃষকের কান্নার আওয়াজ হয়তো মেঘালয়ের পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এখনো নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় আরও প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার পরিস্থিতিও ভিন্ন নয়। ধনু ও ঘোড়াউত্রা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গ্রাস করে নিয়েছে প্রায় ৩,২০০ হেক্টর জমির ধান।
নেত্রকোণার খালিয়াজুরী ও মদন উপজেলার ডিঙ্গাপোতা ও গনেশের হাওরের নিচু অংশের ২,৮০০ হেক্টর জমি এখন অথৈ পানির নিচে। এই যে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেল, এর পেছনে কি শুধু প্রাকৃতিক কারণ দায়ী? নাকি আমাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং পরিকল্পনার অভাবও এখানে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে? প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণ আর মেরামতের নামে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তার সার্থকতা নিয়ে আজ সাধারণ মানুষের মনে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। মাটির বাঁধ দিয়ে ঢলের তীব্র স্রোত ঠেকানোর যে সনাতন পদ্ধতি আমরা অনুসরণ করছি, তা বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আর কার্যকর নয়।
হাওরের অর্থনীতি একক ফসলি বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। এই একটি ফসল হারানো মানে হলো একটি পরিবারের সামগ্রিক মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়া।
সুনামগঞ্জ সদরের কৃষক আব্দুর রহমান ২০ বিঘা জমির ধান হারিয়ে যখন ডুকরে কেঁদে ওঠেন, তখন সেই কান্নার অনুরণন প্রতিটি সংবেদনশীল হৃদয়ে আঘাত করে। তিনি মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছিলেন, এনজিওর কিস্তি শোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু আজ তাঁর সব স্বপ্ন পানির নিচে। এই এক আব্দুর রহমান কেবল এক ব্যক্তি নন, তিনি লক্ষ লক্ষ হাওরবাসীর প্রতিচ্ছবি। ফসল নষ্ট হওয়ার ফলে হাওরাঞ্চলে যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়, তা কাটিয়ে উঠতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ভিটেমাটি বিক্রি করে শহরে পাড়ি জমায়, কেউবা দিনমজুর হিসেবে অমানুষিক পরিশ্রমে লিপ্ত হয়। চালের বাজারেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে। দেশের অন্যতম প্রধান খাদ্য সরবরাহকারী অঞ্চল যদি এভাবে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য।
তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তিন মাসের সহায়তার ঘোষণাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। খাদ্য সহায়তা, নগদ অর্থ, বীজ-সার বিতরণ এবং পুনর্বাসন কর্মসূচির যে রূপরেখা তিনি দিয়েছেন, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা এখন প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। ত্রাণ মন্ত্রী জানিয়েছেন যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ১০০ দিনের কর্মসূচির আওতায় প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল ও নগদ ৫০০ টাকা দেওয়া হবে। সরকারের কৃষি পুনর্বাসন খাতে ৭০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ এই সংকট উত্তরণে নিঃসন্দেহে বড় শক্তি।
তবে মূল দাবি হলো স্থায়ী সমাধান।
আমরা আর কতকাল ত্রাণের অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকব? হাওরবাসীর আর্তনাদ বন্ধ করতে হলে আমাদের সনাতন চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রথমত, মাটির ক্ষণস্থায়ী বাঁধের বদলে আমাদের বৈজ্ঞানিক ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের দিকে যেতে হবে। সিসি ব্লক বা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে এমন প্রতিরক্ষা দেয়াল তৈরি করতে হবে যা পাহাড়ি ঢলের প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে পারে। বাঁধ নির্মাণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির রন্ধ্রপথগুলো বন্ধ করা এখন জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, নদী ও খাল খনন করে পানির ধারণক্ষমতা বাড়ানো এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করা জরুরি। পলি জমে নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত উপচে পড়ে।
সরকারের স্মার্ট কৃষি মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীদের এমন সব ধানের জাত উদ্ভাবন করতে হবে যা স্বল্প সময়ে অর্থাৎ আগাম বন্যার আগেই ঘরে তোলা যায়। পাশাপাশি ধান কাটার জন্য পর্যাপ্ত 'কম্বাইন হারভেস্টার' সরবরাহ করা গেলে শ্রমিক সংকট এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও দ্রুত ফসল সংগ্রহ করা সম্ভব হতো।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে অনিশ্চয়তা এখন ধ্রুব সত্য। তাই কৃষিবীমা বা 'ক্রপ ইনস্যুরেন্স' চালু করা এখন বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি। কোনো দুর্যোগে যদি ফসলহানি ঘটে, তবে এই বীমা কৃষকের আর্থিক মেরুদণ্ড সোজা রাখতে সাহায্য করবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্মার্ট বাংলাদেশের যে স্বপ্ন, তার কেন্দ্রে থাকতে হবে আমাদের এই সাহসী কৃষকরা। ডিজিটাল 'ফার্মার কার্ড' বা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সহায়তা প্রেরণের মাধ্যমে অনিয়ম রোধ করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কৃষি কর্মকর্তাদের এই সংকটকালীন সময়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ ছেড়ে মাঠে নেমে আসতে হবে। কৃষকদের সাথে কথা বলতে হবে, তাদের সাহস দিতে হবে এবং সহায়তার প্রতিটি কণা যেন সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে হাওরাঞ্চল এক চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাত জাগা কৃষকরা বাঁধে বসে যখন পানির উচ্চতা মাপেন, তখন তাদের বুকের ধুকপুকানি আমরা অনুভব করতে পারি। প্রধানমন্ত্রীর এই তিন মাসের সহায়তা তাদের মনে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কিন্তু সেই স্বস্তি যেন কেবল নথিপত্রে সীমাবদ্ধ না থাকে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম যেন রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের উঠান পর্যন্ত পৌঁছায়। সরকারের এই অঙ্গীকার যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবেই আবার হাওরের উর্বর মাটি সোনালি হাসিতে ভরে উঠবে।
আমরা চাই না প্রতি বছর হাওরের পানি কৃষকের চোখের জলের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাক। আমরা চাই একটি স্থায়ী সমাধান, একটি টেকসই ভবিষ্যৎ। হাওরের কান্না থামুক, হাসুক আমাদের প্রিয় কৃষক—এই প্রত্যাশায় সারা দেশ আজ হাওরবাসীর ব্যথায় ব্যথিত ও সংহতিবদ্ধ। দেশের অন্নদাতাদের এই অসম লড়াইয়ে সরকারের পাশে থাকা শুধু রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নয়, এটি একটি জাতীয় ও নৈতিক কর্তব্য।
শেষ পর্যন্ত হাওরের উর্বর মাটি আবার সোনালি ধানে ভরে উঠুক, কৃষকের মুখে ফিরে আসুক সেই চিরচেনা হাসি, আর আমাদের শিশুরা আবার খেলতে পারুক সেই সবুজ মাঠে—এই আশা নিয়েই আমরা আগামীর দিকে তাকিয়ে আছি। হাওরের বুকে এখনো হাহাকার চলছে ঠিকই, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অন্ধকার কেটে যাবে এবং এক নতুন ভোরের উদয় হবে।
কৃষকেরা আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন, কারণ তারা জানেন যে এই রাষ্ট্র এবং তার নেতা তাদের পাশে আছেন। দেশের প্রতিটি মানুষের দোয়া আর সরকারের কার্যকর পদক্ষেপই পারে হাওরের এই বিধ্বংসী ট্র্যাজেডিকে এক উজ্জ্বল সাফল্যে রূপান্তর করতে।
আজকালের খবর/ এমকে