দেশজুড়ে জ্বালানি তেল নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়; বরং এটি ধীরে ধীরে জাতীয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর মারাত্বক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা শহর, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য এখন পরিচিত হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও তেল না থাকার নোটিশ ঝুলতে দেখা যাচ্ছে, আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে তেল দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি বক্তব্যে সংকটের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন এক চিত্র ফুটে ওঠেছে। বাস্তবতা হচ্ছে তেল নেই তো গাড়ির চাকা ঘুরছেনা,জীবন চালানো অস্বস্থিকর হয়ে ওঠছে তেলের অভাবে।
মূলত: ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডন, সৌদি আরব, সাইপ্রাসের ওপরে ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করা জাহাজেও হামলা চালাচ্ছে ইরান। একই ভাবে ইরান সমর্থিত লেবাননের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহও সংঘর্ষে যোগ দিয়ে লেবাননের অভ্যন্তরে তাদের ঘাঁটিগুলো থেকে ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করছে। আবার তার জবাবে ইসরায়েলও লেবাননে হেজবুল্লাহর ঘাঁটিগুলোর ওপরে হামলা করেছে।
অন্যদিকে, বিশ্বে জ্বালানী তেলের সিংহ ভাগই সাগর পথে পরিবহনের পথ হচ্ছে ইরানের‘হরমুজ প্রাণালী’। এই হজরমুজ প্রণালীকে বলা হয়, জ্বালানী তেলের বৈশ্বিক ‘লাইফ লাইন’। গত ২৮ ফেব্রুয়ারী ইরানের উপর হালা চালায় ইসরারইল এবং যুক্তরাষ্ট্রি। মূলত: সেই থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বে ও বিভিন্ন দেশে এলপিজি,এলএনজি এবং জ্বালানী তেলের সংকট শুরু হয়।
এই পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরান-কে ঘিরে সংঘাত। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। যেহেতু বাংলাদেশ তার জ্বালানির বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে মেটায়, তাই এই বৈশ্বিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব দেশের বাজারে পড়ছে। সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে না পড়লেও, অনিশ্চয়তা স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।
তবে কেবল বৈশ্বিক পরিস্থিতিই নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু কারণও এই সংকটকে দৃশ্যমান করে তুলছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ আতংক তৈরি হয়েছে। এ কারণে মানুষের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে কিছু অসাধু গোষ্ঠীর মজুতদারি প্রবণতা বাজারে সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট করছে। সংঘাতের খবর পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই দেশজুড়ে এই অসাধু ব্যবসায়ীরা বেআইনিভাবে বিভিন্ন কায়দায় তেল মজুত করে গুদামঘরে রেখে দিচ্ছে এবং গাহকরা আসলে তাদের তেল নাই, তেল দেওয়া যাবে না বলে বিদায় করছে।
শুধুমাত্র অবৈধ মজুতদার চক্র শুধু তেল মজুত করেই খান্ত হচ্ছেনা, বরং তারা রাতের আধাঁওে পেট্রল পাম্পের তেল, গ্যাস চড়া দামে কালো বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানিকৃত তেলের চালান আসতে সময় লাগা এবং চাহিদা-সরবরাহের সাময়িক অসামঞ্জস্যতা। সব মিলিয়ে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে কাগজে-কলমে সংকট না থাকলেও বাস্তবে চাপ স্পষ্ট।
এই অস্থিরতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে কৃষি ও পরিবহন খাতে। গ্রামাঞ্চলে সেচ পাম্প চালাতে ডিজেলের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি, বিশেষ করে বোরো মৌসুমে। অনেক কৃষকই সময়মতো ডিজেল না পাওয়ায় সেচ কার্যক্রমে বিঘেœর আশঙ্কা করছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাক ও নৌযান জ্বালানির অভাবে বাধাগ্রস্ত হলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। তখন এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামে। শহরাঞ্চলেও এর প্রভাব কম নয়; রাইড শেয়ারিং চালকদের আয় কমে গেছে এবং সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াত ব্যয় বেড়ে গেছে।
জ্বালানি সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যুৎ খাতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই সরবরাহ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যার ফলে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তা ছাড়া বিদ্যুত,গ্যাস ছাড়া সার উৎপাদন ব্যহত হলে সারের অভাবে কৃষিকে বিরুপ প্রভাবক পড়ার আশংকাও তৈরী হয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের একটি কাঠামোগত দুর্বলতা এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সীমিত মজুত সক্ষমতা। আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী যেখানে কম পক্ষে ৬ মাসের জ্বালানি মজুত রাখা প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশ সাধারণত তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়ের জন্য মজুত রাখতে সক্ষম।
ফলে বৈশ্বিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও দ্রুত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রভাব ফেলে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পদক্ষেপ। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়ানো, সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটানো এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
বর্তমান সংকট হয়তো সাময়িক, কিন্তু এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রতি দেশের সংবেদনশীলতা আবারও সামনে এসেছে। তাই এখনই যদি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
লেখক: বায়োকেমেস্ট্রি ও বায়োটেকনোলজি বিষয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।
আজকালের খবর/ এমকে