শনিবার ১৮ এপ্রিল ২০২৬
বৈরি আবহাওয়ায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশের কৃষি
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:১১ পিএম   (ভিজিট : ৯৮)
মনুষ্য সৃষ্ট সংকটের সাথে যুক্ত হয়েছে বৈরী প্রকৃতি। দ্বিমুখী এই সংকটে বিরুপ প্রভাব পড়ছে কৃষি  প্রধান বাংলাদেশের কৃষি ক্ষেত্র্যে। ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধে জ¦ালানী তেলের সংকটে চলতি বোরো মৌসুমে সেচ কাজে বিঘœ ঘটছে। অন্যদিকে, জলবায়ু  পরিবর্তনের প্রভাবে এবারের চৈত্র মাস তার পরিচিত ছন্দ ধরে রাখতে পারেনি। আগেকার  নিয়ম ভেঙ্গে এ মাসে প্রকৃতি যেন একসঙ্গ তিনটি রূপে আর্বিভুত হয়েছে। এ কারণে একদিকে রাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কুয়াশা, শহরাঞ্চলে তাপপ্রবাহ এবং  শহরে গ্রামে সমভাবে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত।  প্রকৃতির এই ত্রিমুখী সংঘাতে কৃষির জন্য সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

সাধারণত: কৃষি ও কৃষকের দিনপঞ্জিতে চৈত্র মাস  গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণ। রবিশস্যের শেষ ভাগ, খরিপ মৌসুমের সূচনা আর বোরো ধানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় এটি। কোথাও ধানের ঢেউ, কোথাও গমের সোনালি আভা, ভুট্টার সারি এবং সবজির সবুজ বিস্তার– এ মাসেই দেখা সম্ভব। কিন্তু শস্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত দেশের উত্তরপ্রান্ত যখন ভোরে ঘন কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে, ঠিক তখন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পুড়ছে খরতাপে। আবার হঠাৎ কালবৈশাখী এবং টানা বৃষ্টিতে ডুবে যাচ্ছে হাওরের বোরো ফসল। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই আবহাওয়ার এই বৈরি আচরণ। এতে বেশি ক্ষতি হবে গাছগাছালির। বাড়বে ফসলের রোগবালাই। কমবে উৎপাদন। উত্তরের জনপদ পঞ্চগড়ে এবার চৈত্রের সকালে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা অনেকের কাছেই বিস্ময়ের। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকছে তেঁতুলিয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। সড়কে চলাচল করা যানবাহনকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে হচ্ছে। মাঠ, ফসলি জমি, এমনকি গাছপালার পাতায় জমছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিশির বিন্দু। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা, দিন-রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়া এবং হঠাৎ বৃষ্টির প্রভাব মিলিয়ে এই বাষ্পীয় কুয়াশা তৈরি হয়েছে।

একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী গত ১০ এপ্রিল সকাল ৯টায় পঞ্চগড়ে সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ছিল ১৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসে আর্দ্রতা ছিল ৯৯ শতাংশ। গত শনিবারও এই এলাকায় কুয়াশা দেখা গেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের আকাশেও চৈত্র মাসে পৌষের মতো কুয়াশা দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার হালকা কুয়াশা দেখা গেলেও শনিবার অনেক বেশি কুয়াশা দেখা যায়। এক সপ্তাহ ধরে এসব এলাকায় সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ২৮ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। মাঝেমধ্যে বৃষ্টিও হয়েছে। পঞ্চগড় সদরে সকালে উঠে দেখি, চারদিক কুয়াশায় সাদা হয়ে গেছে। বয়স্করা বলেন, চৈত্রে কুয়াশা হলে বৈশাখে বন্যা হয়। একজন পরিবেশ বিঞ্জানী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়ার এই অস্বাভাবিকতা দেখা দিয়েছে। 

চৈত্রে তীব্র গরম থাকার কথা; বাস্তবে শীতের আমেজ যাচ্ছে না। এমন ঘন কুয়াশা দেখা যাচ্ছে, যা আগে এ সময়ে ছিল না। এ ধরনের কুয়াশাকে বাষ্পীয় কুয়াশা বলে। বায়ুম-লে আর্দ্রতা বেশি থাকলে এবং দিন-রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গেলে জলীয় বাষ্প দ্রুত ঘনীভূত হয়ে কুয়াশা তৈরি হয়। দখিনা বাতাস, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা, হঠাৎ বৃষ্টি এবং আকাশে দীর্ঘ সময় মেঘ থাকার কারণেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।  উত্তরের এই কুয়াশার বিপরীতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিরাজ করছে তীব্র তাপপ্রবাহ। চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। প্রখর রোদে মাঠে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। কৃষি শ্রমিকদের কাজের সময় কমে যাচ্ছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক জায়গায় সড়কের পিচ নরম হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। 

গত ১০ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৩৪ শতাংশ। শুক্রবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয় চুয়াডাঙ্গায় ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শনিবার এ জেলায় তাপমাত্রা ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়। এরপর যশোর; এ জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী  ড.  কামরুজ্জামানের মতে, এ অঞ্চলে বর্তমানে ধানের থোড় আসছে। এ সময় তাপপ্রবাহ ধানের জন্য ক্ষতিকর। ৩৫ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা থাকলে ধান চিটা হয়ে যাবে। তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির বেশি হলে ক্ষেতে পানি ধরে রাখতে হবে। কারণ, ধানের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা হচ্ছে দিনের বেলায় ৩৫ ডিগ্রির নিচে ও রাতে ২৬ ডিগ্রির নিচে থাকলে উৎপাদন ভালো হয়।

কাজেই এ দুই বিপরীত চিত্রের মাঝখানে কৃষির জন্য রয়েছে আরেকটি দু:সংবাদ অর্থাৎ অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত। চলতি চৈত্রে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। মার্চ মাসজুড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের এই অসম অবস্থায় কৃষির জন্য হুমকী। উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় তুলনামূলক কম বৃষ্টি– এই বৈপরীত্য কৃষি ব্যবস্থাপনাকে কঠিন করে তুলছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান হচ্ছে, ২০২২ সালের চৈত্র মাসে বৃষ্টি হয়েছে ছয় দিন, ২০২১ সালে আট দিন, ২০২০ সালে পাঁচ দিন, ২০১৯ সালে সাত দিন, ২০১৮ সালে চার দিন ও ২০১৭ সালে চার দিন। আর এ বছরের চৈত্র মাসে ২০ দিনের মধ্যে ১২ দিনই বৃষ্টি হয়েছে।  দেশে মার্চের স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাত ৪৭ মিলিমিটার। কিন্তু এ বছর মার্চে সারাদেশে গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৬২ মিলিমিটার। এ বছর মার্চে অন্যান্য বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ঢাকায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৬৮ মিলিমিটার, যা স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাতের তুলনায় ৪৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। সিলেটে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ২৪০ মিলিমিটার, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ১১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। রাজশাহীতে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৫৪ মিলিমিটার, যা স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাতের তুলনায় ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। রংপুরে মার্চে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১২৩ মিলিমিটার, স্বাভাবিকের চেয়ে ৩২৮ শতাংশ বেশি। ময়মনসিংহে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১১৬ মিলিমিটার, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ২১৭ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে এ বছর মার্চের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে মার্চে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে শূন্য দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ১২ থেকে ১৯ মার্চের মধ্যে কালবৈশাখী ও বৃষ্টিতে উত্তরাঞ্চলের রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ১৬ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১৯ হাজার ৬১৪ কৃষক। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, ঝড়ে নষ্ট হয়েছে প্রায় দুই হাজার ১৩১ হেক্টর জমির ফসল, যার বর্তমান বাজারমূল্য ৮৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১৬ জেলার আলুচাষিরা। উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিতে আলু নষ্ট হয়েছে ৯১৬ হেক্টর জমির, কলা নষ্ট হয়েছে ২২৯ হেক্টরের, শাকসবজি নষ্ট হয়েছে ৭৮ হেক্টর জমির, ভুট্টা নষ্ট হয়েছে ৬২৮ হেক্টরের, গম নষ্ট ১০২ হেক্টরের, সূর্যমুখী নষ্ট ১০ হেক্টর জমির, পেঁয়াজ বীজ নষ্ট হয়েছে ৭ হেক্টরের এবং মরিচ নষ্ট হয়েছে ৯ হেক্টর জমির। কৃষির ক্ষতি নিয়ে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা বলছে, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জে অর্ধশত হাওরে অন্তত দুই হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরের দুটি বিলের প্রায় ১০০ বিঘা জমির আধা-পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে এপ্রিল মাসের পূর্বাভাসও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। মাসজুড়ে একাধিক তাপপ্রবাহ, বজ্রবৃষ্টি ও কালবৈশাখীর আশঙ্কা রয়েছে। জুন মাসের পূর্বাভাসেও উঠে এসেছে, তিন থেকে চারটি তীব্র তাপপ্রবাহ হতে পারে এবং ছয় থেকে আটটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ হতে পারে। এমনি অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তন জনিত বৈরি পরিস্থিতি থেকে ফসল রক্ষায় প্রয়োজন নতুন পরিকল্পনা, উন্নত প্রযুক্তি ও অভিযোজন কৌশল। সময়মতো সেচ ও পানি নিষ্কাশন, সহনশীল জাতের ফসল নির্বাচন এবং আগাম আবহাওয়ার তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ তাহলে রক্ষা পাবে ফসল,বাঁচবে কৃষক।

লেখক: মোতাহার হোসেন 
সম্পাদক-ক্লাইমেট জার্নাল২৪.কম,সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম। 

আজকালের খবর/বিএস 









Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে ৫ কৃষকের মৃত্যু
বগুড়া ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি শফিক, সম্পাদক পল্লব
নিরাপত্তাকে অজুহাত বানিয়ে অন্যের ‘ভূমি’ দখল করছে ইসরায়েল
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
জ্বালানি সংকটে কুমিল্লা অচল: ৮১টির মধ্যে ৪৯ ফিলিং স্টেশন বন্ধ
লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ট্রাম্পের
প্রজ্ঞানন্দ স্মৃতি সংসদের বর্ষবরণ ও গুনীজন সংবর্ধনা সম্পন্ন
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft