বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আজ এক অদৃশ্য কিন্তু মারাত্মক সংকটে জর্জরিত-অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। জনসংখ্যার চাপ, দ্রুত নগরায়ন এবং দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে এই শহর প্রতিদিনই আবর্জনার ভারে নুয়ে পড়ছে। একদিকে উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে সেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না। ফলে নগরজীবন ক্রমেই অস্বাস্থ্যকর, বিপজ্জনক এবং অমানবিক হয়ে উঠছে।
উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬,৪৬৫ থেকে ৭,৫০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। প্রতিদিন মাথাপিছু বর্জ্য উৎপাদনও ক্রমাগত বাড়ছে_২০২৪ সালে যা ছিল ০.৭৫ থেকে ০.৮০ কেজি, তা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.৮০ থেকে ০.৮৫ কেজিতে। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিপুল বর্জ্যের মাত্র প্রায় ৩৭ শতাংশ নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা হয়। বাকি অংশ খোলা স্থানে, রাস্তার পাশে, নালা-নর্দমায় কিংবা জলাশয়ে জমা হয়ে পরিবেশ দূষণের প্রধান উৎসে পরিণত হচ্ছে।
অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব হলো নগরের পরিবেশগত বিপর্যয়। খোলা স্থানে আবর্জনা ফেলার ফলে বাতাসে বিষাক্ত গ্যাস ছড়ায়, যা শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। নালা-নর্দমায় জমে থাকা বর্জ্য বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে, যা নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। গবেষণা বলছে, ঢাকার বর্জ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই জৈব, যা যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হলেও তা হচ্ছে না।
স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অপরিষ্কার পরিবেশ ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ নানা সংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটায়। বিশেষ করে খোলা ডাম্পিং এলাকাগুলো মশা-মাছির বংশবিস্তার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। শিশু ও বয়স্করা এই দূষণের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।
সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলো ল্যান্ডফিল নির্ভরতা। ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল ইতোমধ্যেই প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। তবুও অপরিকল্পিতভাবে সেখানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, যা মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করছে। উন্নত দেশগুলো যেখানে ল্যান্ডফিল নির্ভরতা কমিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে গেছে, সেখানে ঢাকা এখনও পুরোনো পদ্ধতিতেই আটকে আছে।
প্রশ্ন জাগে-এই সংকটের জন্য দায়ী কে? বাস্তবতা হলো, এটি একক কোনো পক্ষের ব্যর্থতা নয়। সিটি কর্পোরেশনের সীমিত সক্ষমতা, পরিকল্পনার অভাব এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোর ঘাটতি যেমন দায়ী, তেমনি নাগরিক অসচেতনতা ও দায়িত্বহীন আচরণও সমানভাবে দায়ী। যত্রতত্র ময়লা ফেলা, বর্জ্য পৃথকীকরণ না করা, প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহার—এসব অভ্যাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে এই সংকট অমীমাংসিত নয়। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রথমত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। ‘Reduce, Reuse, Recycle’—এই ট্রিপল আর নীতির কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। জৈব ও অজৈব বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ করা গেলে পুনর্ব্যবহার ও কম্পোস্টিং সহজ হবে। এতে ল্যান্ডফিলের উপর চাপ কমবে এবং পরিবেশ দূষণ হ্রাস পাবে। তৃতীয়ত, দরজায় দরজায় বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। অনেক এলাকায় নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ না হওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে খোলা স্থানে ময়লা ফেলে। সুতরাং সেবার মান উন্নয়ন অপরিহার্য। চতুর্থত, আইন প্রয়োগে কঠোরতা আনতে হবে। যত্রতত্র ময়লা ফেলার বিরুদ্ধে জরিমানা ও শাস্তির বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। একইসঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
সবশেষে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্মার্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, আধুনিক রিসাইক্লিং প্লান্ট-এসব উদ্যোগ গ্রহণ করলে বর্জ্যকে বোঝা নয়, সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। ঢাকার বর্তমান বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরেছে—আমরা কি এই অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে থেকেই ভবিষ্যৎ গড়ব, নাকি এখনই পরিবর্তনের পথে হাঁটব? নগরজীবনকে টিকিয়ে রাখতে হলে আর দেরি করার সুযোগ নেই। পরিকল্পিত, টেকসই ও দায়িত্বশীল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই হতে পারে একটি বাসযোগ্য ঢাকার একমাত্র পথ।
লেখক: অধ্যাপক, গবেষক ও কলামিস্ট, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
আজকালের খবর/বিএস