ঢাকায় বৃষ্টি মানেই জলাবদ্ধতা—এ যেন এখন আর নতুন কোনো খবর নয়, বরং নগরবাসীর প্রতিদিনের দুঃসহ বাস্তবতা। সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি—সবখানেই জমে যায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমনকি দিনের পর দিন পানি না নামায় নগরজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। প্রশ্ন জাগে—একবিংশ শতাব্দীর একটি রাজধানী শহর কেন এখনও এমন দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাছে জিম্মি?
ঢাকার জলাবদ্ধতার সমস্যা মূলত বহুমাত্রিক, যার কেন্দ্রে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। গবেষণায় দেখা গেছে, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ সক্ষমতা এবং অপরিকল্পিত পাইপলাইন নির্মাণ দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ। অথচ এ সমস্যা নতুন নয়—বছরের পর বছর ধরে এটি ক্রমেই জটিল হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ঢাকার প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়া। একসময় এই শহরে প্রায় ৬৫টি খাল ছিল, যা বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে পৌঁছে দিত। এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৩টিতে, যার বড় অংশই দখল ও ভরাটের শিকার। একইভাবে, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (BIP)-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ৯,৫৫৬ একর জলাধার ও বন্যা প্রবাহ অঞ্চলের মধ্যে ৩,৪৪০ একর ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। অর্থাৎ শহরের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে।
ড্রেনেজ ব্যবস্থার আরেকটি বড় শত্রু হলো পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় ব্যবহৃত একবারের প্লাস্টিকের প্রায় ৮০ শতাংশই রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়, যা পরে ড্রেন ও খালে জমে পানি প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টি করে। এমনকি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন ভারী বৃষ্টি না হলেও মাঝারি বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়—শুধুমাত্র ড্রেনগুলো পলিথিনে বন্ধ হয়ে থাকার কারণে।
বাস্তবতা হলো, ড্রেনগুলো যেন এখন আর পানি নিষ্কাশনের পথ নয়, বরং ময়লা-আবর্জনার ডাম্পিং স্টেশন। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সরাসরি জলাবদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত—এটি বিভিন্ন গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে। অথচ নাগরিক সচেতনতা এবং প্রশাসনিক নজরদারির মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ হলো সমন্বয়ের অভাব। ঢাকার পানি ব্যবস্থাপনায় একাধিক সংস্থা—ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড—একসঙ্গে কাজ করলেও কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে সমস্যা থেকেই যায়। কোথাও ড্রেন নির্মাণ হয়, কিন্তু তার সঙ্গে সংযোগ নেই খালের; কোথাও খাল খনন করা হয়, কিন্তু ড্রেন পরিষ্কার করা হয় না। ফলে পুরো ব্যবস্থাটি একটি বিচ্ছিন্ন ও অকার্যকর কাঠামোতে পরিণত হয়েছে।
প্রকৃতির দিক থেকেও ঢাকা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। গড়ে বছরে প্রায় ১,৮৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় এই শহরে এবং বর্ষা মৌসুমে আশপাশের নদীর পানির স্তর বেড়ে গেলে শহরের ভেতরের পানি স্বাভাবিকভাবে বের হতে পারে না। এতে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। কিছু এলাকায় পানি জমে থাকে ৫০-৭০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত এবং কয়েক দিন স্থায়ী হয়—যা একটি আধুনিক শহরের জন্য লজ্জাজনক।
এর প্রভাব শুধু যানজট বা ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। জলাবদ্ধতা অর্থনৈতিক ক্ষতি, কর্মঘণ্টা নষ্ট, অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের বিস্তারও এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। অর্থাৎ এটি শুধু একটি নগর সমস্যা নয়—এটি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি।
সমাধান কী? প্রথমত, প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনরুদ্ধার করলে ঢাকার জলাবদ্ধতার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সমাধান সম্ভব। দ্বিতীয়ত, কঠোরভাবে পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সমন্বিত পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতা। একাধিক সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সবশেষে বলতে হয়, ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়—এটি আমাদের নিজের তৈরি সংকট। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে
।
ঢাকাকে বাঁচাতে হলে এখনই ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নইলে প্রতি বর্ষায় রাজধানী ডুবে যাওয়ার এই লজ্জাজনক চিত্রই হয়ে উঠবে আমাদের স্থায়ী পরিচয়।
লেখক: অধ্যাপক, গবেষক ও কলামিস্ট; বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
আজকালের খবর/ এমকে