বৃহস্পতিবার ২৫ জুন ২০২৬
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আরও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:১৯ পিএম   (ভিজিট : ৪২৫)
গত রবিবার একদিনেই দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৫৬৪ শিশু—যা একদিনে সর্বোচ্চ রেকর্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ১৪৩ জন। একই দিনে আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের একজন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুসারে, ১৫ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৪৩ শিশু এবং উপসর্গ নিয়ে ২১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ঢাকায় মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি—উপসর্গ নিয়ে ১০২ এবং নিশ্চিত হামে ২৮ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। একই সময়ে ৩২ হাজার ২৮ শিশু উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে এবং ৪ হাজার ৬০৩ জন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্যে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে যে ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ হাজার ১৬১ সন্দেহজনক কেস এবং প্রায় ৩ হাজার নিশ্চিত কেস রিপোর্ট হয়েছে, সাথে ১৬৬ সন্দেহজনক ও ৩০ নিশ্চিত মৃত্যু। এই প্রাদুর্ভাব ৫৮টিরও বেশি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে, যা জাতীয় পর্যায়ে উচ্চ ঝুঁকির সংকেত দিচ্ছে।

এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; এগুলো হাজার হাজার পরিবারের কান্না, অসহায়ত্ব এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার গল্প। হাসপাতালের করিডোরে অভিভাবকদের অস্থির পায়চারি, শিশুদের দুর্বল শরীরে অক্সিজেনের নল, রাত জেগে থাকা চিকিৎসক-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রম-এসব দৃশ্য আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরছে। হাম শুধু একটি সাধারণ শৈশব রোগ নয়। এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) এবং এমনকি দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক জটিলতা সৃষ্টি করে। অপুষ্ট শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকরা বলছেন, হামের জটিলতায় শয্যা, অক্সিজেন ও আইসিইউ সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শতাধিক শিশু ভর্তি হয়েছে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২০ দিনে ২৭৫ শিশু ভর্তি হয়েছে যাদের ২৬ জন মারা গেছে। প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ শিশুর মৃত্যুর খবর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চিন্তিত করে তুলছে।

গাজীপুর থেকে আসা রহিম মিয়া নামের এক অভিভাবক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ১১ মাসের ছেলে রাহাতের জ্বর দিয়ে শুরু। তারপর শরীরে লাল দাগ। তিন দিনের মধ্যে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। হাসপাতালে বেড পেতে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। গ্রামে টিকা পাইনি।” মিরপুরের শাহিনা আক্তার বলেন, “আমার দুই বছরের মেয়ে সুমাইয়া পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে। অন্য শিশুদের দেখে ভয় লাগে। সরকার যদি আগে টিকা নিশ্চিত করত, তাহলে এত কষ্ট হতো না।” এই অভিভাবকদের কথায় ফুটে উঠেছে গ্রাম-শহরের সাধারণ মানুষের যন্ত্রণা।

প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে গত দুই বছরে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকাদান কর্মসূচিতে সাময়িক ঘাটতি এবং কোভিড-পরবর্তী সময়ে রুটিন ইমিউনাইজেশন ব্যাহত হওয়া। অনেক জেলায় কভারেজ ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে আসায় হার্ড ইমিউনিটি দুর্বল হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, ৭৯ শতাংশ কেস পাঁচ বছরের নিচের শিশু, যাদের মধ্যে ৬৬ শতাংশ দুই বছরের নিচে এবং ৩৩ শতাংশ নয় মাসের নিচে। অপুষ্টি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

তবে সরকার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত সাড়া দিয়েছে। ৫ এপ্রিল থেকে জরুরি এমআর টিকাদান অভিযান শুরু হয়েছে, যা প্রথমে ১৮টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলার ৩০টি উপজেলায় চালু হয় এবং পর্যায়ক্রমে সারাদেশে বিস্তৃত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, “টিকাদান ঘাটতি স্বীকার করে আমরা দ্রুত সাড়া দিয়েছি। সার্ভেইল্যান্স জোরদার করা হয়েছে, হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড বাড়ানো হয়েছে এবং অতিরিক্ত ডাক্তার-নার্স মোতায়েন করা হয়েছে।” এখন পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে এবং অভিযান সারাদেশে চলছে।

এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়; এটি বিশ্বব্যাপী হামের পুনরুত্থানের অংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে বিশ্বে ২৫৪,৩৮৪ নিশ্চিত হামের কেস রিপোর্ট হয়েছে, যার ২৯ শতাংশ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে। শীর্ষ আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ইয়েমেন (৩২,৪৪৮ কেস), নাইজেরিয়া (১৯,২২৫), পাকিস্তান (৮,৭২১), সুদান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১,৭৯২ নিশ্চিত কেস দেখা গেছে, যা তাদের মিজলস-ফ্রি স্ট্যাটাস হারানোর ঝুঁকি তৈরি করেছে। মেক্সিকোতেও হাজার হাজার কেস রিপোর্ট হয়েছে। ইউরোপ ও সেন্ট্রাল এশিয়ায় ২০২৫ সালে কেস ৭৫ শতাংশ কমেছে (১২৭,৪১২ থেকে ৩৩,৯৯৮-এ), কিন্তু ২০২৬ সালেও কেস শনাক্ত হচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী রুটিন টিকাদান ব্যাহত হয়েছে, যার ফলে লাখ লাখ শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

বিভিন্ন দেশ এই সংকট মোকাবিলায় কী করছে? যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি জরুরি সার্ভেইল্যান্স জোরদার করেছে, আউটব্রেক এলাকায় টার্গেটেড ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে এবং জনসচেতনতা বাড়াচ্ছে। মেক্সিকো ও কানাডায় রুটিন ইমিউনাইজেশন শক্তিশালী করে হাই-রিস্ক গ্রুপকে অতিরিক্ত ডোজ দেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ যেমন ইয়েমেনে জাতীয় স্বাস্থ্য জরুরি কমিটি সক্রিয় করে আউটরিচ ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে এবং জাতিসংঘের সহায়তায় টিকা সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। নাইজেরিয়া ও সুদানে এনজিও ও জাতিসংঘ মোবাইল ক্লিনিক, ভ্যাকসিন ডেলিভারি এবং কমিউনিটি আউটরিচ চালাচ্ছে। আফ্রিকার অনেক দেশে গাভি অ্যালায়েন্সের সহায়তায় টিকা সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপে টিকা কভারেজ ৯৫ শতাংশে তোলার লক্ষ্যে ক্যাম্পেইন চলছে। বিশ্বব্যাপী সাধারণ ব্যবস্থাগুলো হলো: দুই ডোজ এমআর ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা, সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম শক্তিশালী করা, দ্রুত আউটব্রেক রেসপন্স, ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টেশন এবং জনসচেতনতা ক্যাম্পেইন।

বাংলাদেশ এই বিশ্বব্যাপী প্রেক্ষাপটে দৃষ্টান্ত স্থাপন করার সুযোগ পেয়েছে। সরকারের জরুরি টিকাদান অভিযান, হাসপাতালে আইসোলেশন বেড বৃদ্ধি, অক্সিজেন সাপ্লাই নিশ্চিতকরণ, সার্জ টিম মোতায়েন এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রশংসনীয়। ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফ এবং গাভির সহায়তায় ভ্যাকসিন স্টক বাড়ানো হয়েছে। পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ থাকলে এমন বিপর্যয় ঘটত না।

তবে বর্তমান পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। এই প্রাদুর্ভাব শুধু স্বাস্থ্যখাতের সংকট নয়, এটি একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। গরিব পরিবারগুলো চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক পরিবারে বড় ভাই-বোনের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালের শয্যা সংকট, অক্সিজেনের অভাব এবং গ্রামীণ এলাকায় টিকাদানের সীমাবদ্ধতা এখনও রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য রুটিন ইমিউনাইজেশনকে শক্তিশালী করতে হবে, নিয়মিত সাপ্লিমেন্টারি টিকাদান ক্যাম্পেইন চালাতে হবে, অপুষ্টি দূর করতে পুষ্টি কর্মসূচি জোরদার করতে হবে এবং সম্প্রদায় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। টিকা নিয়ে ভুল ধারণা দূর করা এবং প্রতিটি শিশুকে নয় মাস ও ১৫ মাস বয়সে এমআর ডোজ নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। ইউরোপের অনেক দেশে টিকা কভারেজ ৯৫ শতাংশে উন্নীত করে হাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। আফ্রিকার কয়েকটি দেশে মোবাইল ক্লিনিক এবং কমিউনিটি আউটরিচের মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকায় পৌঁছানো হয়েছে। বাংলাদেশেও এমন উদ্ভাবনী পদক্ষেপ—যেমন মাইক্রোঅ্যারে প্যাচের মতো নতুন প্রযুক্তি, ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ—বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

হামের মতো রোগে শিশু মৃত্যু একটি প্রতিরোধযোগ্য বিপর্যয়। সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, অভিভাবক, এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সমাজের সকল অংশের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই ছোবল থামবে না। আজ যদি আমরা দায়িত্বশীল হই, তাহলে আগামী প্রজন্মকে আরও বড় মূল্য দিতে হবে না। শিশুদের হাসি ফিরিয়ে আনতে, তাদের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এখনই আরও সক্রিয়, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। টিকা, সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা এবং শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা—এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের এই লড়াই জয়ী হবে। বাংলাদেশ তার শিশুদের সুরক্ষায় বিশ্বের কাছে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা এবং দৃঢ় বিশ্বাস।

লেখক: মো. শাহজাহান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক









Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft