শনিবার ২৫ এপ্রিল ২০২৬
ঢাকার পানিসংকট: এখনই কি জাগবে সচেতনতা?
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৪২ পিএম   (ভিজিট : ১১৯)
ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী এবং দেশের নয় শুধু বিশে^র অন্যতম বৃহৎ জনবহুল নগরীও ঢাকা। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং উন্নয়নের ফলে এই শহর আজ বহুমাত্রিক সমস্যায় জর্জরিত। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক  সমস্যা হলো পানিসংকট। নিরাপদ.দূষণমুক্ত ও পর্যাপ্ত পানির অভাব ঢাকার নাগরিক জীবনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই গ্রীষ্মে নগরীতে পাইন সংকট তীব্র আকার ধারণ কতরে। এই সংকট মোকাবেলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। না হলে অদূর ভবিষ্যতে সংকট আরো বাড়বে। 

ঢাকায় পানির প্রধান উৎস হলো ভূগর্ভস্থ পানি। বছরের পর বছর অতিরিক্ত হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে অনেক স্থানে গভীর নলকূপেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না বা পেতে বেশি সময় ও খরচ লাগছে। অন্যদিকে, নদী ও খালগুলোর দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করায় সেগুলো থেকে পর্যাপ্ত পানি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। শিল্পকারখানার বর্জ্য, নোংরা পানি এবং প্লাস্টিক বর্জ্য নদীতে ফেলার ফলে পানির গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পানিসংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো পানির অপচয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পানি ব্যবহার করে এবং সচেতনতার অভাবে পানি সংরক্ষণে আগ্রহী নয়। এছাড়া, পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ পাইপলাইনের কারণে বিপুল পরিমাণ পানি অপচয় হয়। এসব সমস্যার কারণে শহরের অনেক এলাকায় প্রতিদিন পানির ঘাটতি দেখা দেয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কষ্টকর করে তোলে।

ঢাকার তীব্র পানিসংকট একটি গুরুতর সমস্যা হলেও এটি সমাধানযোগ্য। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জনগণের সচেতনতা। এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই সময় থাকতে সচেতন হয়ে উদ্যোগ নেওয়াই আমাদের সবার দায়িত্ব। বিশ্ব ধরিত্রী দিবস উপলক্ষে বিশ্বের নানা দেশে পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকারের কথা উঠে এলেও ঢাকার বড় অংশ এখনো তীব্র পানিসংকটে করনীয় ও পানির মানের অবনতির সঙ্গে লড়াই করছে—যা নীতিগত অঙ্গীকার ও বাস্তবতার ব্যবধানকে স্পষ্ট করে তুলছে। উচ্চ আদালতের একটি যুগান্তকারী রায়ে নিরাপদ পানযোগ্য পানিকে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে এটিকে জীবনের অধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দেওয়া ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি চলতি বছরের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। রায়ে পানি উৎস রক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ এবং ভূগর্ভস্থ পানির টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়।তবে বাস্তবে রাজধানীর পরিস্থিতি তেমন উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ করছেন বাসিন্দারা। মিরপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, কল্যাণপুর, পূর্ব মনিপুর ও পীরেরবাগ এলাকায় দীর্ঘ সময় পানির সরবরাহ বন্ধ থাকছে, কোথাও দিনে অল্প সময়ের জন্য পানি এলেও তা অনিয়মিত।

নগরবাসির অভিমত, তাদের অনেকই “নিয়মিত পানি পাচ্ছে না। যখন আসে তখনও নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত।”গত দুই সপ্তাহ ধরে বাধ্য হয়ে বোতলজাত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। শেওড়াপাড়া, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায়ও একই অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক জায়গায় রাতের বেলায় পানি সরবরাহ দেওয়া হলেও তা অনিয়মিত। ঢাকা ওয়াসা বলছে, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, পাম্পিং স্টেশনের মেরামত, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এসব সমস্যা হচ্ছে। তবে সংস্থাটি সামগ্রিক ঘাটতি না থাকলেও “লোকালাইজড ক্রাইসিস” বা নির্দিষ্ট এলাকার সংকটের কথা স্বীকার করেছে। ঢাকার দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ২৯০ থেকে ৩০৫ কোটি লিটার, যেখানে প্রয়োজন প্রায় ৩১০ কোটি লিটার। প্রায় আড়াই কোটি মানুষ এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যার প্রায় ৭০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানি থেকে সরবরাহ করা হয়।

ওয়ারপো’র পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কিছু এলাকায় প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০ থেকে ১২ ফুট নিচে নেমে যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণ, উন্মুক্ত জায়গা কমে যাওয়া এবং কংক্রিট কাঠামোর বিস্তারের কারণে প্রাকৃতিকভাবে ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মতে, ঢাকাকে টেকসই পানি ব্যবস্থার দিকে নিতে হলে ভূ-পৃষ্ঠের পানি ব্যবহার বৃদ্ধি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মৌসুমি পানিসংকট ভবিষ্যতে স্থায়ী নগর সংকটে রূপ নিতে পারে।

প্রসঙ্গত: নগরীর পানি সংকট মোকাবিলায় উচ্চ আদালতের রায় ও জাতিসংঘের ২০১০ সালের পানিকে মানবাধিকারের স্বীকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকলেও বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে বিশ্ব ধরিত্রী দিবসে পরিবেশ সুরক্ষার প্রেক্ষাপটে ঢাকায় পানি সংকট অত্যন্ত গুরুত্বসহ আলোচনায় পরিস্থিতি সম্পর্কে ওঠে এসেছে। তাতে দ্রুত নগরায়ণকেন্দ্রিক শহরগুলোর পানিসুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করা শুধু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাই নয়, বরং পরিবেশগত শাসন ও নগর টেকসইতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

এই সংকট নিরসনে প্রথমেই প্রয়োজন পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নদী ও র্ভূপৃষ্ঠস্থ: পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ জন্য নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করতে হবে এবং পানি শোধনাগার স্থাপন করতে হবে। শিল্পকারখানাগুলোকে বাধ্য করতে হবে যেন তারা বর্জ্য শোধন করে তবেই তা নদীতে ফেলে। দ্বিতীয়ত, পানির অপচয় রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। প্রতিটি নাগরিককে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে অপ্রয়োজনীয় পানি ব্যবহার কমাতে হবে এবং পানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে।

তৃতীয়ত, বষর্ া মৌসুমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। রেইনওয়াটার হারভেস্টিং পদ্ধতির মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।  এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে পানির সংকট কিছুটা হলেও লাঘব হবে। এবং চতুর্থত:আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পানির লিকেজ শনাক্ত করার জন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে অপচয় কমানো সম্ভব। পাশাপাশি স্মার্ট পানি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু করলে পানির সঠিক বণ্ঠন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এজন্য  সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু সরকার একা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। প্রত্যাশা থাকবে, নগরীর সকল মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাজধানীবাসির পানিসংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।

মোতাহার হোসেন: সম্পাদক-ক্লাইমেট জার্নাল২৪.কম,সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম।

আজকালের খবর/বিএস 









Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
বিজয়নগরে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের শীর্ষ সদস্য নাজমুল গ্রেপ্তার
যে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি সেটাকে রিভাইভ করা সহজ নয়: অর্থমন্ত্রী
উচ্ছেদ হওয়া হকারদের দ্রুত পুনর্বাসনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে নতুন উদ্যমে কাজ করছে দেশবন্ধু গ্রুপ
দুই প্রজন্মের কন্ঠে ‘বাবা ছেলের গান’
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft