ডিজিটাল রূপান্তরের এই যুগে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা যেমন দ্রুততর হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে নতুন ধরনের ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ। রূপান্তরের এই পথচলায় প্রযুক্তি যেমন উন্নয়নের চালিকাশক্তি, তেমনি এর নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল লিটারেসি (Digital Literacy) ও আইনি সুরক্ষা (Legal Protection) বিষয় দুটি এখন পারস্পরিকভাবে নির্ভরশীল এবং গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে “ডিজিটাল লিটারেসি” বা ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং “আইনি সুরক্ষা” এখন কেবল আলোচনার বিষয় নয়, বরং নাগরিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্যই ডিজিটাল সমাজ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক ও নৈতিক দিকগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
মোবাইল ফোন এখন নিত্য ব্যবহারে পরিণত হয়েছে। শুধু কথা বলাই নয়, কেনাকাটা থেকে শুরু করে আধুনিক ব্যাংকিং এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের অন্যতম মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশের ৮১ শতাংশেরও বেশি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। আবার মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও সবার নিজস্ব মোবাইল ফোন নেই। নিজের মোবাইল ফোন আছে, এমন মানুষ ৫৭ শতাংশ।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা গত এক দশকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের ৪৯ শতাংশ মানুষ নিজে ব্যক্তিপর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে এবং ৫৬ শতাংশ পরিবার ইন্টারনেটের আওতায় এসেছে। স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এই ডিজিটাল সুবিধার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে সাইবার প্রতারণা, তথ্য চুরি, ভুয়া খবর ছড়ানো, অনলাইন হয়রানি ইত্যাদি সমস্যা।
ডিজিটাল লিটারেসি বলতে সাধারণত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) ব্যবহারের দক্ষতাকে বোঝানো হলেও আধুনিক গবেষণায় এটি একটি বহুমাত্রিক ধারণা হিসেবে বিবেচিত। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে তথ্য অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ ও যাচাই করার সক্ষমতা, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিরাপদ ও নৈতিক আচরণ, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও শেয়ার করার দক্ষতা এবং সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের সক্ষমতা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড়ো অংশের মানুষ এখনো এই বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখে না।
ফলে তারা সহজেই প্রতারণার শিকার হন, যেমন ফিশিং লিংক, ভুয়া লটারি, বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয় জালিয়াতি।এতে একদিকে যেমন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির সন্মুখিন হন তেমনি সামাজিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্থ হন। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটিরও বেশি । তবে ব্যবহারকারীর এই পরিমাণগত বৃদ্ধির সঙ্গে গুণগত দক্ষতার সমন্বয় ঘটেনি। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নারী, এবং প্রবীণদের মধ্যে ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি তুলনামূলক বেশি।
বাংলাদেশে ডিজিটাল লিটারেসির একটি বড়ো বাধা হলো ডিজিটাল বিভাজন। এটি তিনটি স্তরে বিদ্যমান (ক) প্রবেশাধিকারের বিভাজন অর্থাৎ ইন্টারনেট ও ডিভাইসের অসম প্রাপ্যতা (খ) দক্ষতার বিভাজন, অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যবহারে পার্থক্য এবং (গ) ব্যাবহারিক বিভাজন অর্থাৎ কে কী উদ্দেশ্যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
এই বিভাজন কমাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, যেমন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন, এবং আইসিটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। তবে গবেষণায় দেখা যায়, এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা অঞ্চলভেদে ভিন্ন। ডিজিটাল ব্যবহারের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশে প্রচলিত কিছু সাইবার ঝুঁকি হলো:ফিশিং ও অনলাইন প্রতারণা, মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি, সাইবার বুলিং ও অনলাইন হয়রানি, ডাটা ব্রিচ ও ব্যক্তিগত তথ্য চুরি এবং ভুয়া খবর (Misinformation/Disinformation) । বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করার ঘটনাও গবেষণায় উঠে এসেছে। ডিজিটাল লিটারেসির অভাবে ব্যবহারকারীরা তথ্য যাচাই না করেই শেয়ার করেন, যা সমস্যা আরও বাড়ায়।
এই বাস্তবতায় ডিজিটাল লিটারেসি (Digital Literacy) বাড়ানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রায় সব কাজই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। এটি বাড়ানোর জন্য ব্যক্তি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকার সব পর্যায়ে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, শিক্ষার শুরু থেকেই ডিজিটাল শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। স্কুল-কলেজে কম্পিউটার ব্যবহার, ইন্টারনেট নিরাপত্তা, এবং তথ্য যাচাই করার মতো বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে শেখানো উচিত। এতে শিক্ষার্থীরা ছোটোবেলা থেকেই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শিখবে।
দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করা যেতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ফ্রি বা স্বল্প খরচে ডিজিটাল স্কিল ট্রেনিং দিলে অনেক মানুষ উপকৃত হবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রশিক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে তারা অনলাইন সেবা, যেমন সরকারি সেবা বা মোবাইল ব্যাংকিং সহজে ব্যবহার করতে পারবে।
তৃতীয়ত, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী দাম নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক জায়গায় এখনো দ্রুতগতির ইন্টারনেট পাওয়া যায় না, যা ডিজিটাল লিটারেসি বৃদ্ধির পথে বাধা। চতুর্থত, সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো দরকার। মানুষকে ফিশিং, ভুয়া খবর, এবং অনলাইন প্রতারণা থেকে বাঁচার উপায় শেখাতে হবে। পঞ্চমত, বাংলা ভাষায় ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি বাড়াতে হবে।
এতে যারা ইংরেজিতে দক্ষ নয় তারাও সহজে প্রযুক্তি শিখতে পারবে। এখানে পরিবার ও সমাজের সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ। যারা প্রযুক্তিতে দক্ষ, তারা অন্যদের শেখাতে এগিয়ে এলে দ্রুত একটি ডিজিটালি সচেতন সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
অন্যদিকে, আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৬ (Cyber Security Act, 2026) আইন প্রণয়ন করেছে।
এ আইনের উদ্দেশ্য হলো অনলাইন অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধীদের শাস্তি প্রদান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সুরক্ষা দেওয়া। তবে বাস্তব প্রয়োগে এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে যেমন আইন সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাব, প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি।
বাংলাদেশে আইনি সুরক্ষা কার্যকর করার ক্ষেত্রে কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে এরমধ্যে সচেতনতার অভাব অন্যতম। অনেকেই জানেন না সাইবার অপরাধের শিকার হলে কোথায় কীভাবে অভিযোগ করতে হবে। ফলে অনেক ঘটনার রিপোর্টই হয় না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনেক সদস্যের প্রযুক্তিগত দক্ষতার সীমাবদ্ধতার কারণে পর্যাপ্ত সাইবার ফরেনসিক দক্ষতা নেই, যা তদন্তকে জটিল করে তোলে।
বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি আরও একটি বড়ো সমস্যা। সাইবার অপরাধের মামলাগুলো অনেক সময় দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায়, ফলে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পেতে দেরি হয়। আইনের সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ না করে বরং নাগরিক নিরাপত্তা জোরদার করে।
ডিজিটাল লিটারেসি এবং আইনি সুরক্ষা একে অপরের পরিপূরক। ডিজিটাল লিটারেসি বাড়লে মানুষ নিজেরাই অনেক ঝুঁকি এড়াতে পারে। আইনি সুরক্ষা শক্তিশালী হলে অপরাধীদের জন্য প্রতিরোধ তৈরি হয়। উভয়ের সমন্বয় একটি নিরাপদ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন ডিজিটালি সচেতন ব্যবহারকারী ফিশিং লিংক চিনতে পারলে প্রতারণা এড়াতে পারেন, আর আইনি কাঠামো সেই প্রতারককে শাস্তির আওতায় আনতে পারে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রা এখন আর শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আইনি রূপান্তরের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে। এই রূপান্তরকে টেকসই করতে হলে ডিজিটাল লিটারেসি ও আইনি সুরক্ষার সমন্বিত উন্নয়ন অপরিহার্য। এক্ষেত্রে কেবল আইন প্রণয়ন বা প্রযুক্তি বিস্তার যথেষ্ট নয়,প্রয়োজন সচেতন নাগরিক, দক্ষ প্রতিষ্ঠান, এবং জবাবদিহিমূলক আইনি কাঠামো।
এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক আগামীর বাংলাদেশ। ডিজিটাল লিটারেসি এবং আইনি সুরক্ষা এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হতে পারে একটি নিরাপদ, সচেতন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সমাজ। প্রযুক্তি নিজে কখনোই ঝুঁকিপূর্ণ নয়; বরং এর সঠিক বা ভুল ব্যবহারই নির্ধারণ করে এর প্রভাব। তাই প্রয়োজন জ্ঞান, সচেতনতা এবং কার্যকর আইনি কাঠামো,যার মাধ্যমে বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রা হবে নিরাপদ ও টেকসই।
লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, খাদ্য মন্ত্রণালয়
আজকালের খবর/ এমকে