শনিবার ৪ এপ্রিল ২০২৬
হামের আগ্রাসী প্রত্যাবর্তন: জনস্বাস্থ্য কি তবে এক ভয়াবহ সংকটের মুখে?
প্রকাশ: সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬, ৫:১৪ পিএম   (ভিজিট : ৪২৪)
চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্যের এই যুগে এসেও যখন একটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য এবং প্রতিরোধযোগ্য ভাইরাসের থাবায় আমাদের নিষ্পাপ শিশুদের প্রাণ যায়, তখন আমাদের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা ও দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কেবল স্বাভাবিক নয়, বরং অনিবার্য হয়ে পড়ে। রাজশাহী বিভাগে সাম্প্রতিক সময়ে হামের যে ‘আগ্রাসী’ প্রকোপ আমরা লক্ষ্য করছি, তা কেবল একটি আঞ্চলিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা সাময়িক অসুস্থতা নয়; এটি আমাদের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির (EPI) চকচকে পর্দার অন্তরালে রয়ে যাওয়া এক গভীর ও বিষাক্ত ক্ষতের সংকেত। মাত্র তিন সপ্তাহে ৭৭ জন ল্যাব-নিশ্চিত আক্রান্ত এবং ৩ শিশুর করুণ মৃত্যু—এই পরিসংখ্যানটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত ভয়াবহতা এবং সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক চরম অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে।

হামকে আমাদের সমাজে দীর্ঘকাল ধরে একটি সাধারণ শিশুতোষ চর্মরোগ বা ‘বসন্তের ছোট ভাই’ হিসেবে অবহেলা করার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা সাক্ষ্য দেয়, হাম কেবল একটি সাধারণ ভাইরাস নয়, এটি একটি ছদ্মবেশী ঘাতক। বিশেষ করে যখন এটি এক দশকের স্তব্ধতা ভেঙে ‘আগ্রাসী’ রূপে ফিরে আসে, তখন এটি কেবল গায়ে লাল দানা তৈরি করেই ক্ষান্ত হয় না; এটি শিশুর ফুসফুসকে আক্রমণ করে ভয়াবহ নিউমোনিয়া তৈরি করে, স্নায়ুতন্ত্রকে অকেজো করে মস্তিষ্কের প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস ঘটায় এবং এমনকি কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত করে শিশুকে চিরতরে অন্ধ করে দিতে পারে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের ফুসফুসে যে দ্রুতগতিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা প্রমাণ করে যে এবারের ভাইরাসের স্ট্রেইনটি বা ধরণটি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিধ্বংসী।

সবচেয়ে উদ্বেগের এবং বিচলিত হওয়ার মতো বিষয় হলো সংক্রমণের শিকার শিশুদের বয়স। তথ্যমতে, আক্রান্তদের সিংহভাগেরই বয়স ৬ থেকে ৯ মাস। এই বয়সের শিশুরা সাধারণত মায়ের শরীর থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারায়, অথচ আমাদের জাতীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তাদের ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগে হামের প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয় না। এই যে মাঝখানের কয়েক মাসের একটি ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার শূন্যতা, এটিকেই এখন ঘাতক ভাইরাসটি তার প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রশ্ন হলো, আমাদের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কি এই গ্যাপ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না? যদি থেকে থাকেন, তবে কেন এই বিশেষ বয়সের শিশুদের সুরক্ষায় কোনো আগাম ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ বা বিশেষ ব্যবস্থার কথা ভাবা হলো না? আজ পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ বা রাজশাহীতে যা ঘটছে, তা মূলত সেই নীতিনির্ধারণী দূরদর্শিতার অভাবেরই এক নির্মম ফসল।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি ৫ বছর অন্তর দেশে জাতীয় পর্যায়ে হাম-রুবেলার একটি বিশাল ক্যাম্পেইন বা গণ-টিকাদান কর্মসূচি হওয়ার কথা। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে সেই বিশেষ কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হওয়ার কথা থাকলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তা থমকে গেছে। এই যে এক বছরের ‘টিকাদান বিরতি’ বা শিথিলতা, তা মূলত ভাইরাসের জন্য একটি উন্মুক্ত চারণভূমি তৈরি করে দিয়েছে। যখন একটি নির্দিষ্ট বয়সের বিশাল জনগোষ্ঠী বুস্টার ডোজ বা বাড়তি সুরক্ষাবলয় থেকে বঞ্চিত হয়, তখন কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ২০২৬ সালের বড় ক্যাম্পেইনের আশায় হাত গুটিয়ে বসে থাকা কি তবে আমাদের শিশুদের জীবনের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ালো? এই আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার মূল্য এখন দিতে হচ্ছে ৩টি পরিবারের বুক খালি হওয়ার মধ্য দিয়ে।

হামের এই প্রাদুর্ভাব আমাদের সমাজের আরও একটি রূঢ় ও অন্ধকার বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে—তা হলো সচেতনতার চরম অভাব এবং শেকড় গেড়ে বসা অপচিকিৎসা। আজও আমাদের প্রান্তিক জনপদে, এমনকি মফস্বল শহরগুলোতেও হাম হলে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে কবিরাজি, ঝাড়ফুঁক বা নিমপাতার ওপর ভরসা করার প্রবণতা প্রবল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশুটি যখন হাসপাতালে পৌঁছায়, তখন তার ফুসফুস বা স্নায়ুতন্ত্র এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে যে দক্ষ চিকিৎসকদেরও আর কিছু করার থাকে না। রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন এবং বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের পক্ষ থেকে যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে এবং বিশেষ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এই উদ্যোগগুলো কি কেবল হাসপাতালের দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে? মাঠপর্যায়ে প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি বাড়িতে স্বাস্থ্যকর্মীদের সশরীরে পৌঁছানো এবং মায়েদের সচেতন করা নিশ্চিত করা না গেলে কেবল আইসোলেশন ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়িয়ে এই আগ্রাসী মহামারী ঠেকানো যাবে না।

সারা দেশে যে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে, তা যেন কেবল একটি সরকারি ‘প্রেস রিলিজ’ বা কাগুজে নির্দেশে সীমাবদ্ধ না থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের পরামর্শ নেওয়া অবশ্যই যৌক্তিক, কিন্তু আমাদের নিজস্ব মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে যেখানে জনবসতি অত্যন্ত ঘন এবং মানুষের চলাচল বেশি, সেখানে বিশেষ স্ক্রিনিং ও জরুরি টিকাদান কেন্দ্র স্থাপন করা অপরিহার্য। যেসব শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) থেকে কোনো কারণে বাদ পড়েছে (Drop-out), তাদের খুঁজে বের করা এখন কোনো সাধারণ কাজ নয়, এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব।

হাম কেবল একটি একক শিশুর রোগ নয়; এটি একটি সংক্রামক ব্যাধি যা বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একজন আক্রান্ত শিশু তার সংস্পর্শে আসা অন্য ১০ থেকে ১৫ জন শিশুকে আক্রান্ত করতে পারে। সুতরাং এটি কেবল একটি পরিবারের বিপদ নয়, এটি পুরো সমাজের বিপদ। আমরা যদি এখনই একটি জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করে এই প্রাদুর্ভাবের হটস্পটগুলো (যেমন পাবনা বা চাঁপাইনবাবগঞ্জ) ঘিরে বিশেষ অবরুদ্ধ এলাকা বা কন্টেইনমেন্ট জোন তৈরি করে ব্যাপক টিকাদান শুরু না করি, তবে এই আগ্রাসী হাম অচিরেই সারা দেশের প্রতিটি দরজায় কড়া নাড়বে।

পরিশেষে বলতে হয়, একটি রাষ্ট্রের প্রগতি ও উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড বড় বড় দালানকোঠা বা মেগা প্রজেক্ট নয়, বরং তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অর্থাৎ শিশুদের সুস্বাস্থ্যের গ্যারান্টি। হামের মতো একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য এবং যে রোগের টিকা আমাদের হাতে আছে, সেই রোগে যদি এখনো ৩ জন শিশুকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়, তবে তা আধুনিক সভ্যতার জন্য এক বড় কলঙ্ক। রাজশাহীর এই ‘আগ্রাসী’ প্রাদুর্ভাব যেন সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য এখনই সরকারকে সর্বাত্মক ও যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নিতে হবে। ২০২৬ সালের জন্য অপেক্ষা করার বিলাসিতা দেখানোর সময় এখন নেই; বরং এখনই বিশেষ টিকাদান অভিযান শুরু করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সব ধরণের গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করা প্রয়োজন। শিশুদের সুরক্ষা কোনো দয়া বা দান নয়, এটি তাদের জন্মগত অধিকার এবং রাষ্ট্রের পবিত্র ও অবশ্যপালনীয় অঙ্গীকার।

আজকালের খবর/বিএস 







আরও খবর


Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
পাকুন্দিয়ায় ৫ হাজার কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে বীজ-সার বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন
সরকারি পাটবীজ সংরক্ষণের অপরাধে কৃষি কর্মকর্তা ও দোকানিকে অর্থদণ্ড
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের উপ-প্রতিনিধিকে গোপনে বহিষ্কার করলো যুক্তরাষ্ট্র
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
পঞ্চগড়ে শিক্ষকের শেষ কর্মদিবসে রাজকীয় বিদায়
অফিস ৯টা থেকে ৪টা, ৬টায় মার্কেট বন্ধ: মন্ত্রিসভায় গুচ্ছ সিদ্ধান্ত
সংসদ সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক, আসতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft