সোমবার ২০ এপ্রিল ২০২৬
তেলের অবৈধ মজুত ও বিপন্ন জনপদ: মুনাফার নেশায় বন্দি শোষিত মানুষের ভাগ্য
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৪৪ এএম   (ভিজিট : ১০৩৬)
তেলের বাজারে অদৃশ্য সিন্ডিকেট এবং আমাদের যাপিত জীবনের হাহাকার এক নিবিড় ও নিষ্ঠুর সমীকরণে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বর্তমান সময়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও জনজীবনের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার প্রেক্ষাপটে যে বিষয়টি সবচেয়ে বীভৎস রূপে প্রতীয়মান হচ্ছে, তা হলো অসাধু মুনাফালোভী চক্রের অবৈধ মজুতদারি। 

যখন দেশের সাধারণ কৃষক সেচের এক ফোঁটা ডিজেলের জন্য দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছেন, যখন একজন সাধারণ মোটরসাইকেল আরোহী পাম্পে পাম্পে ঘুরে রিক্তহস্তে ফিরে আসছেন, ঠিক তখনই সমাজের এক শ্রেণির নীতিহীন ব্যবসায়ী রাষ্ট্রের সম্পদ কুক্ষিগত করে মাটির নিচে তেলের খনি বানাচ্ছে। 

এটি কেবল ব্যবসায়িক অসততা নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অর্থনীতির মের”দণ্ড ভেঙে দেওয়ার সুপরিকল্পিত দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র। 
সম্প্রতি সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পরিচালিত দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযানে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। 

গত ৩ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত টানা ২৭ দিনের অভিযানে দেশের ৬৪টি জেলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ৩ হাজার ১৬৮টি ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এই তথাকথিত ‘তেল চোর’দের ধরতে পরিচালিত অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি তেল। এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি যদি বাজারে থাকত, তবে হয়তো সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস কিছুটা হলেও লাঘব হতো।

মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র এবং যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী যে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন, তা থেকে স্পষ্ট যে এই সিন্ডিকেটের জাল কত গভীরে প্রোথিত। উদ্ধারকৃত তেলের মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৬৫ লিটারই ছিল ডিজেল।

আমরা জানি, বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি ও পরিবহন ব্যবস্থার প্রাণভোমরা হলো এই ডিজেল। কৃষকের হালের লাঙল থেকে শুর” করে ট্রাক-বাসের চাকা-সবই এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই অমূল্য সম্পদকে একদল হায়েনা নিজেদের গোপন গুদামে বন্দী করে রেখেছিল। এ ছাড়াও উদ্ধার করা হয়েছে ২২ হাজার ৫৩৯ লিটার অকটেন এবং ৪৬ হাজার ১৪৬ লিটার পেট্রোল। 

এই ভয়াবহ অবৈধ মজুতের দায়ে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ১৬ জন অপরাধীকে তাৎক্ষণিক কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ৭৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা জরিমানা। জরিমানার এই অঙ্ক হয়তো তাদের পকেটের তুলনায় সামান্য, কিন্তু রাষ্ট্র যে কঠোর অবস্থানে রয়েছে-এই বার্তাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

জ্বালানি তেলের এই সংকটকে পুঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীদের চাতুর্য ও দুঃসাহস কোন হীন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, তার এক প্রামাণ্য দলিল পাওয়া গেছে নাটোরের সিংড়া উপজেলায়। সেখানে নিংগুইন এলাকার একটি নির্জন বাঁশঝাড়ের ভেতরে লোকচক্ষুর অন্তরালে মাটির নিচে বিশাল বিশাল পানির ট্যাংক পুঁতে তেল লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সিংড়া বাজারের ‘সততা ট্রেডার্স’-এর মালিক র”বেল হোসেন অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে ১ হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ১০টি প্লাস্টিকের ট্যাংক মাটির নিচে স্থাপন করে ১০ হাজার লিটার ডিজেল অবৈধভাবে মজুত করেছিলেন। 

এই ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, মুনাফার লোভে মানুষ কতটা সৃজনশীল হতে পারে অপরাধের ক্ষেত্রে। সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল রিফাত যখন খবর পেয়ে সেখানে অভিযান পরিচালনা করেন, তখন আবিষ্কৃত হয় এই তেলের গুপ্তভাণ্ডার। রুবেল হোসেন স্বীকার করেছেন, উচ্চমূল্যে তেল বিক্রির চক্রান্তেই তিনি এই মজুত গড়ে তুলেছিলেন। এই যে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত আখের গুছিয়ে নেওয়ার বিকৃত মানসিকতা, এটিই আজ আমাদের সমাজের বড় ব্যাধি।

সরকার যখন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি তেল আমদানি করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন এই ধরণের মজুতদারি সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। এই সংকট নিরসনে এবং মজুতদারদের গোপন আস্তানা খুঁজে বের করতে সরকার এখন ‘তথ্যদাতার জন্য পুরস্কার’ এই যুগান্তকারী কৌশল গ্রহণ করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, যারা অবৈধ মজুত ও পাচারকারীদের সঠিক তথ্য দেবেন, তাদের সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ পুরস্কার প্রদান করা হবে।

তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের এই পুরস্কারের অর্থ প্রদান নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও বটে। কারণ এখন থেকে কোনো মজুতদারই তার প্রতিবেশীর ওপর আর আস্থা রাখতে পারবে না। এই পুরস্কারের ঘোষণা সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন সচেতনতা তৈরি করেছে, তেমনি অপরাধীদের মনে সঞ্চার করেছে প্রবল আতঙ্ক।

মাঠ পর্যায়ের কঠোরতার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে বিগত ২৪ ঘণ্টার খতিয়ানেও। একদিনেই সারাদেশে ৩৮৬টি অভিযান চালিয়ে ২১৪টি মামলা করা হয়েছে এবং ৯ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। নীলফামারী জেলায় তিনজনকে ছয় মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনাটি অন্যান্য অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা। 

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ম্যাজিস্ট্রেটরা বর্তমানে দেশের প্রতিটি প্রান্তের ডিপো, ডিলার পয়েন্ট এবং এমনকি খুচরা বিক্রেতাদের মজুত পরীক্ষা করছেন। উত্তরবঙ্গের বগুড়া, সিরাজগঞ্জ এবং দিনাজপুরের মতো কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে নজরদারি কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে। মহাসড়কগুলোতেও ড্রাম ভর্তি তেলের অবৈধ চলাচল ঠেকাতে পুলিশের বিশেষ টহল দল মোতায়েন করা হয়েছে। এই ব্যাপক ভিত্তিক প্রশাসনিক তৎপরতা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এখন তার নাগরিকদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে আপসহীন।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়, কেবল জেল-জরিমানা দিয়ে কি এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব? তেলের এই নৈরাজ্য মূলত বাজারের অব্যবস্থাপনা এবং তদারকি সংস্থার এক ধরণের শৈথিল্যের সুযোগে বেড়ে উঠেছে। বাঁশঝাড়ের নিচে ১০ হাজার লিটার তেল মজুত করা কোনো তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়; এর পেছনে ছিল দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। স্থানীয় পর্যায়ে মাঠ প্রশাসনের যে ধরণের নিবিড় তদারকি প্রয়োজন ছিল, সেখানে কোথাও একটা ফাঁক রয়ে গেছে।

তেলের ডিলারদের কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা এখন সময়ের দাবি। প্রতিটি ফোঁটা তেল কোন পাম্প থেকে কার কাছে যাচ্ছে, তার সঠিক হিসাব যদি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো, তবে রুবেল হোসেনদের মতো অসাধু ব্যবসায়ীরা মাটির নিচে ট্যাংক পুঁতে রাখার সাহস পেত না।

এই বিশ্লেষণে আমাদের গভীরতর আত্মোপলব্ধির প্রয়োজন। আজ যে তেলের জন্য সাধারণ মানুষের হাহাকার, তার একটি বড় কারণ আমাদের নৈতিক স্খলন। ব্যবসায়িক মুনাফা অবশ্যই বৈধ, কিন্তু যখন সেই মুনাফা অন্যের কান্নার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তখন তা অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। 

রাষ্ট্রকে যেমন কঠোর হতে হবে, তেমনি সমাজের সাধারণ মানুষকেও রুখে দাঁড়াতে হবে। তেলের এই রাজনীতি বন্ধ করতে হলে আমাদের সামাজিক প্রতিরোধের দেয়াল গড়ে তুলতে হবে। সিংড়ার ইউএনও যেভাবে সাহসিকতার সাথে অভিযান চালিয়েছেন, প্রতিটি উপজেলায় তেমন নিষ্ঠাবান ও আপসহীন কর্মকর্তাদের বিচরণ প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অংশ।

পরিশেষে, সরকারের এই সাঁড়াশি অভিযান এবং এক লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা কেবল সাময়িক কোনো চমক নয়, বরং এটি হওয়া উচিত একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ার অংশ। তেলের বাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে হলে ডিলার থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। যারা রাষ্ট্রের সম্পদ আত্মসাৎ করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির করে দেয়, তাদের কোনো ক্ষমা নেই। 

আইন তার নিজস্ব গতিতে চলুক এবং এসব অর্থনৈতিক অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ মাটির নিচে তেলের খনি বানানোর দুঃসাহস না দেখায়। তেলের এই অন্ধকার অধ্যায় শেষ হোক এবং দেশের প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি কৃষকের জমিতে পৌঁছে যাক ন্যায্য মূল্যের জ্বালানি-এটাই আজকের প্রত্যাশা।

আজকালের খবর/ এমকে









Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
ভারতে আতশবাজি কারখানায় বিস্ফোরণে নিহত ২০
যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকধারীর গুলিতে ৮ শিশু নিহত
পাকিস্তানে প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছে না ইরান
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
বিয়ের দাবিতে কোটালীপাড়ায় প্রেমিকের বাড়িতে প্রেমিকার অবস্থান
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের এস আর ভি স্টেশনে পরিত্যক্ত জমি অবৈধভাবে দখল: রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার
অবশেষে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালো সরকার
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft