বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক কারণে সিলেট-৩ সংসদীয় আসনটি বরাবরের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিএনপির কাছে এ আসনের মর্যাদা আলাদা, কারণ এখানেই দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শ্বশুরালয় অবস্থিত। (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জমে উঠেছে ত্রিমুখী নয়, বরং সরাসরি দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
এবার ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির যুক্তরাজ্য শাখার সাবেক সভাপতি এম এ মালিক। জনপ্রিয় প্রতীক হাতে পেলেও স্বস্তিতে নেই এই আলোচিত প্রার্থী। তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন তরুণ আলেম হাফেজ মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজু। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হিসেবে ‘রিকশা’ প্রতীক নিয়ে তিনি নির্বাচনী মাঠে লড়ছেন। জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের পূর্ণ সমর্থন পাওয়ায় এই আসনে লড়াই দিন দিন আরও জমে উঠছে।
শেষ মুহূর্তে ১১ দলীয় জোট থেকে মাওলানা রাজুকে প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও শুরুতে যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল, তা দ্রুতই কেটে যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই জামায়াতে ইসলামীসহ জোটভুক্ত প্রায় সব দল একযোগে তার পক্ষে মাঠে নামে। ফলে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভোটের মাঠে তার প্রভাব ও উপস্থিতি বাড়ছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকায় গণসংযোগে গিয়ে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন তিনি। এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে আশাবাদী মাওলানা রাজু মনে করছেন, ভোটের দিন এর প্রতিফলন ঘটবে এবং রিকশা প্রতীক বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় বিএনপির ভেতরে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। পাশাপাশি এম এ মালিক দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করায় তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে পেলে স্থানীয় জনগণ নিয়মিত পাশে পাবেন না—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। অন্যদিকে মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজুর জন্ম, বেড়ে ওঠা ও কর্মক্ষেত্র পুরোপুরি সিলেট-৩ আসনকেন্দ্রিক হওয়ায় স্থানীয়দের কাছে তিনি বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন অনেক ভোটার।
নির্বাচনী মাঠে মাওলানা রাজুর শক্ত অবস্থান ধানের শীষের প্রার্থী এম এ মালিকও টের পাচ্ছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রচারণার সময় তিনি প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাওলানা রাজু বলেন, ধানের শীষের প্রার্থী এম এ মালিক বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ। তিনি আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র। এটি আমাদের পারিবারিক শিক্ষা। তবে রাজনৈতিকভাবে তার পক্ষ থেকে যে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা দুঃখজনক। আমি তাকে এসব মিথ্যাচার বন্ধ করার অনুরোধ জানাই।
উল্লেখ্য, এই আসনে শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছিলেন দক্ষিণ সুরমার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ। পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা দেলওয়ার হোসাইনও শক্ত অবস্থানে ছিলেন। তবে জোটগত সিদ্ধান্তে মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজু প্রার্থী হওয়ার পর সবাই একযোগে তাকে বিজয়ী করতে মাঠে নামেন। এতে ভোটের সমীকরণ দ্রুত পাল্টে যেতে শুরু করেছে।
রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় না থাকলেও ছাত্রজীবনে ছাত্র মজলিসের তুখোড় নেতা ছিলেন মাওলানা রাজু। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষা ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। বর্তমানে তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া হোসাইনিয়া গহরপুরের প্রিন্সিপাল। পাশাপাশি কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের সহ-সভাপতি ও অন্যতম নীতিনির্ধারক এবং কওমি বোর্ডগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা আল-হাইয়্যাতুল উলয়ার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রভাবশালী তরুণ আলেম হিসেবে সারাদেশেই তার পরিচিতি রয়েছে।
মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজুর বাবা ছিলেন প্রখ্যাত আলেম শাইখুল হাদিস আল্লামা নূরউদ্দীন আহমদ গহরপুরী। তিনি দীর্ঘ প্রায় নয় বছর কওমি শিক্ষাবোর্ডের সভাপতি ছিলেন। বাবার পরিচিতি ও নিজের বহুমুখী কর্মকাণ্ডের সুবাদে মাওলানা রাজু আগে থেকেই সিলেট-৩ আসনের মানুষের কাছে জনপ্রিয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে সিলেট-৩ আসনে ধানের শীষ ও রিকশা প্রতীকের লড়াই এখন নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত হয়েছে।
আজকালের খবর/ এমকে