রবিবার ২৬ এপ্রিল ২০২৬
কবিতা, নিমগ্ন ধ্যানের ধূমকেতু
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২১, ৭:৫৭ পিএম  আপডেট: ০৯.১২.২০২১ ৮:০৩ পিএম  (ভিজিট : ১১০৫)
নিউইয়র্কের প্রাচীন বইয়ের দোকান, ‘এরগোসি বুক স্টোর’ আমার কর্মস্থল থেকে খুব দূরে নয়। মাঝে মাঝেই লাঞ্চ আওয়ারে সেখানে গিয়ে বই নাড়াচাড়া করি। প্রায়ই একজন পাঠককে নিমগ্ন বসে থাকতে দেখি। তিনি কবিতার বই পড়ছেন। আমি দূরে থেকে দেখে অন্য সেলফে মনযোগ দিই। বেশ কিছুদিন এভাবে দেখার পর আমার তার সাথে কথা বলার আগ্রহ জন্মে। একদিন পাশের ছোট্ট টেবিলে গিয়ে বসি। কফি খেতে খেতে তার সাথে আলাপ জুড়ার চেষ্টা করি।

জনাথান এডামস। নিজেই পরিচয় দেন। আমিও পরিচয় দিয়ে কথা বলা শুরু করি। আমি কবিতা লিখি, বাংলা ভাষায় আমার কবিতার বই আছে জেনে তিনি আরেকটু গম্ভীর হয়ে চোখ তুলে তাকান।

বলি, আপনাকে সবসময়ই কবিতা পড়তে দেখি! কবিতার পাঠক তো বিশ্বের সর্বত্রই কম! তিনি হেসে ওঠেন! বলেন, আগুনে আঙুল পোড়াতে সবাই পারে কি! আমি কিছুটা উৎসুক হই। ‘কবিতার সাথে আগুন আর আঙুলের কী সম্পর্ক!’ আমার কথা শুনে তিনি আরো জোরেই হাসতে থাকেন।

‘তুমি না কবিতা লিখ, বললে!’-  প্রশ্ন করেন তিনি। ‘হ্যাঁ, লিখি তো!’ ‘তাহলে কবিতা আর আগুনের সম্পর্ক তুমি জানো না!’-তার কণ্ঠে তীর্যক প্রশ্ন।

আমি বলি, কবিতায় আগুন থাকে, তা জানি। কিন্তু কবিতার আগুনে আঙুল পোড়ায় ক’জন! তিনি বলেন, আমি কবিতা পড়ি না, ভালো কবিতার অগ্নি পান করি!

এভাবেই তার সাথে আমার কথা হয় কবিতা নিয়ে। বুঝি তিনি বুক স্টোরের ওই কর্নারে বসে নিয়মিতই অগ্নি-পান করেন!

কবিতা নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণ বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। এখনও হয়। তবে একটা কথা আমি অটল সিদ্ধান্ত নিয়েই রেখেছি, যারা কবিতার নামে অক্ষরে লিখে রাখেন- এদের সকলেই কবি নয়। তাহলে কবি কারা? কার কবিতা বেঁচে থাকে?

এই যে সোশ্যাল মিডিয়া, সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার কবিতা আমাদের নজরে আসে। আমরা অগ্রহ নিয়ে তার দিকে তাকাই। হয়তো একবার পড়াও হয়ে যায়।

কিন্তু এই যে একবার পড়া, তা কি স্থায়ী হয়? খুব কমই, খুব কম কবির কবিতাই পুনরায় পাঠের যোগ্য হয়। পাঠ করতে ইচ্ছে করে।

একটি কবিতার দু’একটি লাইন যদি আপনার কানে না বাজে, বুকে না লাগে- তাহলে আপনি ওই কবিতাটি পড়বেন কেন?

হ্যাঁ, একজন কবি যখন তার পাঠকের কাছে বিশ্বস্ততা অর্জন করতে সক্ষম হয়ে যান- তখন পাঠক সেই কবির কবিতা খুঁজে খুঁজেই পড়েন।

আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে, একজন কবি যখন সমুদ্রে বার বার ঢেউয়ের গর্জন তুলতে সক্ষম হন- তখনই তার পাঠক বাড়ে। কবিতার প্রসারও স্থায়ী হতে থাকে জনমানসে। কবিতায় যারা এই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তারা এভাবেই অর্জনের কাছাকাছি যেতে পেরেছেন। শর্টকাট কোনো দরজা তারা খুঁজেনওনি। কিংবা ‘সিসিমফাঁক’-এর মতো কোনো দরজা তাদের জন্য খুলে যায়ওনি।

আচ্ছা, তাহলে ভালো কবিতাটি কি? এর সংজ্ঞা কি? তার আগে আসুন আমরা জানার চেষ্টা করি, কবিতার সংজ্ঞা কী দিতে চাইছেন এই সময়ের একজন খ্যাতিমান কবি।

কবিতার শরীর কাটলে রক্ত বেরোয়।
অথচ আত্মা থাকে অবিক্ষত।
না পালায় ছন্দ তাহার ফসকা গেরোয়-
একা গাছ, মাঠের মাঝে বজ্রাহত।
 
সে তরুণ অনেক আয়ুর পার দেখেছে
সে প্রবীণ অনেক সুরের আলাপচারী।
কবিতার মধ্যে বাঁচে সর্বনেশে
দেখে বেশ ভাবায়, যেন, আমিও পারি।
 
কিন্তু যখন প্রবল বিস্ফোরণে
উড়ে যায় উল্কাপিছু মাথার হদিশ
কাটা মন ছটফটালে পলাশবনে
এসে চোখ ধুইয়ে বাঁচায় অশ্রুনদী...
 
তখনও কাব্যকে খুব জাপটে থাকা
তখনও সত্যি বলা পঙক্তিগুণে
তখনও জ্যোৎস্না থেকে আঘাত ছাঁকা
তখনও চাদর বোনা রৌদ্র ধুনে
 
এ নেহাত একজীবনের সামর্থ্য নয়।
এ বরং জাতিস্মরের ফেরত আসা।
যে-লেখায় জন্ম নেবে আবার প্রণয়,
তারই মুখ দেখতে আসে বাংলা ভাষা।
 
কবিতার শরীরে তাই রক্ত বেরোয়।
অথচ আত্মা থাকে অবিক্ষত।
যেভাবে তাঁর কবিতা আগুন পেরোয়-
আমরা কেউ পারিনি, জয়ের মতো...
 
[রক্ত আগুন কাব্য লেখা/ শ্রীজাত] 

কবি এই কবিতাটি লিখেছেন এই সময়ের আরেক আলোচিত কবি জয় গোস্বামী’কে উদ্দেশ করে। ‘আমরা কেউ পারিনি, জয়ের মতো’! আমি বলি, পারার দরকার’টাই বা কী!  

দুই.  

আমাদের অনেক তরুণ কবি আছেন, যারা ভাবেন আমাকে অমুক কবির মতো লিখতে হবে! এর কারণ কি? কবিতায় যারা আসেন তাদের প্রথমেই মনে রাখা দরকার, কবিতায় নিজস্বতা নির্মাণ না করলে কবিতা লিখে লাভ নাই।

একজন কবি কিংবা লেখক নিজেকে পৃথক করবেন নিজেই। অন্য কেউ তা করে দিতে পারে না। সেটা নির্ভর করছে, তিনি কী ভাবে করবেন। কোন পথ বেছে নেবেন। সাহিত্যে সততা বিষয়টি খুবই দরকারি ও জরুরি। সৎ না হলে বুকে হাত দিয়ে কেউ সাহস দেখাতে পারে না। আর এই সৎ হতে হলে, অবশ্যই ন্যায়ের পক্ষে, উৎসের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।

সমাজে, সাহিত্যে দোনামোনা বলতে কিছু নেই। সংশয়বাদীদের ঈশ্বর-প্রকৃতি-আত্মা কিছুই নেই। আগে নিজের উপর আস্থা তৈরি করতে হবে। ‘আমি যা বলছি-বুঝে বলছি’, ‘আমি যা করছি বুঝে করছি’- এমন আত্মবিশ্বাস তৈরি করা খুবই জরুরি।

যে কথাটি না বললেই নয়, তা হচ্ছে ওয়েবে সাহিত্যের যে ধারা তৈরি হয়েছে- তা আমাদের সাহিত্যের বীজতলাকে চরম ভাবে বিনষ্ট করে দিচ্ছে। এটা মানতেই হচ্ছে, ওয়েবের যে ঢেউ- তা তো আটকানো যাবে না। কথা হচ্ছে, সেটা কেউ কীভাবে ব্যবহার করবেন। মানুষ সম্পাদনার ধার ধারছে না। যা কিছু ইচ্ছে মতো লিখে ফেসবুক, ব্লগ, ওয়েবম্যাগে দিয়ে দিচ্ছে। শাণিত লেখাগুলো নিজেরা পড়ছে না। অগ্রজ এবং মেধাবী লেখকের লেখা না পড়েই, নিজেকে অনেক বড় কবি দাবি করছে।

এটা সাহিত্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর দিক। আমাদের সমাজে এখন ‘শিক্ষক সাহিত্যিক’-এর সংখ্যা প্রচুর। মানে যারা বাংলা পড়ান- এরা অনেকেই নিজেকে ‘কবি’ দাবি করেন! এমন প্রবণতা আগেও ছিল। এখন তা বহুগুণে বেড়েছে। আমি বলছি না- শিক্ষকরা লেখক হতে পারবেন না। তবে বিদ্যায়তনে বাংলা পড়ানো আর বাংলা ভাষার লেখক কিংবা কবি হওয়া এক নয়।

অসম্পাদিত লেখা বিষয়ে আমার কথা একটিই, বিশেষ করে ওয়েবম্যাগাজিনগুলো যেন সম্পাদনা করে ভালো লেখাগুলো প্রকাশ করে। এর সম্পাদকেরা যেন একটু হিসেবি হয়ে ওঠেন। কারণ ওয়েবের হিট বাড়ানোর জন্য আজে-বাজে লেখা প্রকাশ করাটাও এক ধরণের অপরাধ। আপনি বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি করছেন। আবর্জনা চাপিয়ে দিচ্ছেন। দিতে চাইছেন।

তিন. 

কজন কবিকে এটাই মনে রাখতে হয়, জগতে চন্দ্র, সূর্য, নদী, সমুদ্র, পাহাড়, ফুল, নক্ষত্র, মানুষ- যেমন ছিল তেমনই আছে। হ্যাঁ যা বদলেছে- তা হলো সময়। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এখন প্রযুক্তি পৌঁছে গিয়েছে মানুষের দোরগোড়ায়। তাই কবিতাকেও নির্মাণ করতে হয় সেই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে।

আমি মনে করি, ‘আধুনিক’ শব্দটি হচ্ছে চলমান। ফলে ‘উত্তরাধুনিক’- বলে যারা ঝড় তুলতে চান, তাদের আমার কাছে বেশ ফ্যাকাশেই মনে হয়। কারণ আধুনিকতা যেখানে শেষই হয়নি কিংবা হয় না- সেখানে এর পরবর্তী ধাপ নিয়ে এত কথা কেন?

কবিতায় নিজেকে সমর্পণ করার পূর্বশর্ত হচ্ছে, এর আগে যারা সমর্পিত হয়েছেন- তাদের প্রকারটি জেনে নেওয়া। এই কাজটি অনেক তরুণ করতে চান না। আর চান না, বলেই আজ বাংলা কবিতার সিংহভাগ অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এই যে নাজুক অমাবস্যা আমাদের চারিদিকে- তা থেকে ভালো কবিতাকে পরখ করা যাবে কীভাবে!

এ বিষয়ে আমার প্রথম বিবেচনা হচ্ছে, শিল্পিত সত্তার বিনির্মাণ। একজন কবি যখন নিজেকেই লিখতে পারে- তখনই তার কবিতা হয়ে উঠে অনেকের পড়ার উপপাদ্য বিষয়। কিন্তু সেই লেখাতো সকলের হয় না। সবসময় হয় না। কেন হয় না- এর কারণ অনেক। কারণ সব কথা একজন কবি বলতে পারে না। বলার সাহস করতে পারে না। যারা সাহস করতে পারে, তারাই কবি হয়ে ওঠে। বাকীরা চলে যায়, কালের গহীনে।

কবিতাকে বলা যায়, শব্দের কারুকাজ। ‘এ পেইনটিং অব ওয়ার্ডস’। কবিতাকে বলা যায়, নিজেকে প্রকাশের আবছায়া। কবিতাকে বলা যায়, সৌন্দর্য প্রকাশের গীতল সংগীত।

বাংলা কবিতায় অনেক ধুমকেতুর আবির্ভাব আমরা দেখেছি। এই ধুমকেতু শত বছরে একবার দেখা যায়। আবার এর কম সময়েও দেখা যায়। কবিতায় এর উদাহরণ খুঁজে নেওয়ার দায়িত্ব আমি পাঠকের উপরই রেখে গেলাম। তবে এটা বলতে চাই, সূর্যের টুকরো অংশের নাম কবিতা। যা মানুষকে পোড়ায়, আলো দেয়, আবার দেয় ধ্যানের একান্ত সন্ন্যাসও। যে সন্ন্যাস একান্তই নিজের। এর কোনো ভাগীদার নেই। ভাগীদার হতে কেউ চায়ও না। 

আজকালের খবর/আরইউ









সর্বশেষ সংবাদ
নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিজ্ঞানী ও কৃষি শ্রমিকদের অবদান রয়েছে: কৃষিমন্ত্রী
ভোটের প্রচারণায় এগিয়ে মনোজ বৈদ্য
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগে সমতা চায় টিআইবি
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সুবাহর শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন
তাদের মাখো মাখো ‘প্রেমের প্রাসাদ’!
‘আমাকে জায়গা দিন, এটা আমার প্রাপ্য’ : লালকেল্লার দাবিদার মোগল সম্রাজ্ঞী
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft