বয়স যখন মাত্র ৫ কি ৬, তখন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার কোনো এক বস্তি থেকে হারিয়ে গিয়েছিল ছোট্ট সুমন। সেই থেকে শুরু। আজ ২৫ বছরে পা রাখা সুমন গত ৭ বছর ধরে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন শুধু একটি ডাক শোনার আশায়— 'মা'। গলার সাইনবোর্ড কিংবা হাতের রঙিন খেলনা, সবকিছুর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক হারানো জননীকে ফিরে পাওয়ার তীব্র আকুতি।
বর্তমানে ময়মনসিংহের গৌরীপুর রেলওয়ে জংশন এলাকায় বসবাস করা সুমনের সম্বল এখন রঙিন পাখা, পাখির বাঁশি, চরকি আর শিশুদের নানা খেলনা। ফেরিওয়ালা সেজে তিনি ঘুরে বেড়ান স্টেশনে স্টেশনে, ট্রেনে আর হাট-বাজারে। সুমন জানান, "মা আমাকে ডাকে, আমি সেই ডাক শুনতে পাই। একাকী বসে থাকলে মায়ের স্পর্শ অনুভব করি। আমার বিশ্বাস মা বেঁচে আছেন এবং আমি তাকে খুঁজে পাবই।"
স্মৃতি হাতড়ে সুমন জানান, তার মায়ের নাম সম্ভবত ছিল 'রোজি'। যাত্রাবাড়ী এলাকায় বস্তিবাসীরা তাকে এই নামেই ডাকত। মা হারিয়ে যাওয়ার পর কিছুদিন ঢাকার শিশুপার্ক ও উদ্যানে ভবঘুরে হিসেবে কাটানোর পর ঠাঁই হয় যাত্রাবাড়ীর একটি এতিমখানায়। ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর এতিমখানা ছাড়তে হলে আবারও ঠিকানা হয় কমলাপুর রেলওয়ে জংশন ও জাতীয় স্টেডিয়াম এলাকা। তখন থেকেই গলায় ‘মা ফিরে এসো, মাকে খুঁজে দাও’ লেখা বড় বড় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ঢাকার অলিগলিতে ঘুরতেন তিনি।
জীবনধারণের জন্য সুমন এখন খেলনা ফেরি করেন। ৮ টাকার পাখা বিক্রি করেন ২০-৩০ টাকায়, ১০ টাকার বাঁশি ১৫ টাকায়। এই সামান্য আয়েই চলে তার যাযাবর জীবন। সুমন বলেন, "এতিমখানা থেকে বের হয়ে গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছিলাম। কিন্তু টাকা দিয়ে কী করব? আমার তো আপন বলতে কেউ নেই। তাই ফেরিওয়ালা হয়েছি যাতে দেশজুড়ে ঘুরতে পারি আর মাকে খুঁজতে পারি।"
গৌরীপুর স্টেশনের স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল রউফ দুদু ও মোস্তফা কামাল জানান, সুমন অত্যন্ত সহজ-সরল ও বিনয়ী একজন মানুষ। সে কারও ক্ষতি করে না, শুধু সুযোগ পেলেই চোখের জল ফেলে তার হারানো মায়ের গল্প শোনায়। মায়ের বয়সী কাউকে দেখলেই থমকে দাঁড়ান সুমন, অপলক চেয়ে থাকেন যদি চেনা কোনো অবয়ব খুঁজে পাওয়া যায়।
সুমন মিয়ার আশা, গণমাধ্যমে তার এই আর্তি দেখে হয়তো কোনোদিন তার মা তাকে নিতে আসবেন। ২৫ বছর বয়সী এই যুবকের সাত বছরের নিরন্তর পথচলা কি শেষ হবে মায়ের আঁচলের ছায়ায়? সেই উত্তর আজও অজানাই রয়ে গেছে।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব