“সময় হলো নদীর মতো, নদী হলো বর্তমান। নদীর কাছে বর্তমানই সত্য। আমাদের জীবনও নদীর মতো” - জার্মান সাহিত্যিক হেরমান হেসের উপন্যাস ‘সিদ্ধার্থ’ অবলম্বনে নাটকটি নির্দেশনা ও নাট্যরূপও দিয়েছেন রেজা আরিফ। অনুবাদ করেছেন জাফর আলম। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে ২২ ও ২৩ এপ্রিল প্রদর্শিত হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে তপ্ত আবহাওয়া উপেক্ষা করে নাটকটির সবগুলো শো-ই হাউজফুল ছিল শিল্পকলার এক্সপিরিমেন্টাল হলে।
সিদ্ধার্থ বইটিতে বলা হয়েছে- যে কোনো কিছুর গভীরে আমূল প্রবেশ করে সকল ক্ষুধা পরিতৃপ্ত না করলে জগত-সংসার থেকে প্রকৃতপক্ষে নাকি বের হওয়া যায় না। আমারও তাই অভিমত। সিদ্ধার্থ চরিত্রে প্রথম অংশটিতে অভিনয় করেছেন কাজী নওশাবা আহমেদ। নির্মাতা রেজা আরিফ এই ঐতিহাসিক নির্বানপ্রাপ্ত চরিত্রের যে কোন জেন্ডার হয়না আধ্যাত্নিক জগতে- সেটি সুনিপূণভাবে নির্দেশনা দিয়ে আবারও প্রমাণ করলেন।
গৌতম বুদ্ধের আরেক নাম সিদ্ধার্থ হলেও হেরমান হেসের সিদ্ধার্থ কোনো বুদ্ধধর্মীয় চরিত্র নয়। রেজা আরিফ বলেছিলেন এক সাক্ষাতকারে, ‘গৌতম বুদ্ধের ঔজ্জ্বল্যে আড়াল হয়ে পড়া গৌতমের ব্যক্তিগত মনোজগতের রঙে সিদ্ধার্থকে আঁকা হয়েছে।’
এই নাটকে পার্থ প্রতিম, কাজী নওশাবা আহমেদ, জিনাত জাহান নিশা, ওয়াহিদ খান, আরিফুল ইসলাম নীল, প্রকৃতি নাজারিন সহ অনেকে অভিনয় করেছেন। নির্বাহী প্রযোজক স্নেহা চন্দ্রা।
সিদ্ধার্থের আগের শো গুলো দেখে এতই মনমুগ্ধ হয়েছিলাম যে- এবার গ্রুপ হয়ে সিদ্ধার্থ দেখতে গিয়েছিলাম, আর তবুও মনে হলো যেন এ এক নতুন উদ্ভাস। আরশিনগরের মঞ্চায়নে সেই বিরল জাদু আছে যা বার বার দেখার ফলেও অভিজ্ঞতাকে ম্লান করে না, বরং বোধকে আরও গভীর করে তোলে। পুরো প্রযোজনাটাই ছিল জীবন্ত। দুর্দান্ত ছবি তুলছে প্রায় প্রতিটা শো-এর শাদাব শাহরোখ হাই, অশেষ কৃতজ্ঞতা।
কলাকুশলীরা আসলেই হারমান হেসের আধ্যাত্মিক যাত্রা মঞ্চে ধরা দিতে পেরেছেন। শিল্প নির্দেশনা সেতো এক নীরব সৌন্দর্য্য! সিদ্ধার্থের আকাঙ্ক্ষা, সংশয় আর জাগরণের পথ—সংযমের সঙ্গে উপস্থাপিত, তবুও রেখে যায় দীর্ঘস্থায়ী ছাপ। রেজা আরিফের সংবেদনশীল নির্দেশনায় ছন্দ, নীরবতা আর ভিজ্যুয়াল কবিতার মাধ্যমে অন্তর্জগত উন্মোচিত হয়েছে, দর্শকদের টেনে নিয়েছে এক যৌথ আত্মচিন্তার ভেতর।
ধমনীতে আবারও সেই শিহরণ- “অন্তর্যামী পুরখ বিধাতে”, সঙ্গীতটি যতবার বেজে উঠেছে- চোখের জল ধরে রাখাটা ততই মুশকিল। আবার শুনে মনে হলো যেন মহাজাগতিক ঘরে ফিরে এসেছি। ধ্যানমগ্ন, অনুরণিত, গভীরভাবে প্রশান্তিদায়ক—প্রদর্শনী শেষ হওয়ার অনেক পরেও রেষ রয়ে গেল মনে। হেরমান হেসের বইটি উপহার দিয়েছিল ২০ বছর আগে এক ছাত্র সঞ্জয়, ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা একজন শিক্ষকের পক্ষ হতে।
“আমি আর কোন যোগ বেদ, অথর্ব বেদ, সন্ন্যাসী কিংবা অন্য কোনো মতবাদ দ্বারা পরিচালিত হব না। আমি নিজের কাছ থেকেই শিখব, নিজেই নিজের ছাত্র হব; আমি নিজেকেই জানব—সিদ্ধার্থের সেই রহস্যকে”- হেরমান হেসে