ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেওয়ারিশ লাশের ওয়ারিশ হিসেবে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে “ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর” নামে একটি সামাজিক সংগঠন।
তরুণ প্রকৌশলী মো. আজহার উদ্দিন প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি গত ৫ বছরে ২৫০টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে মানবিকতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। প্রকৌশলী মো. আজহার উদ্দিন সংগঠনটির চেয়ারম্যান।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিকেলে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের লাশ দাফনের মাধ্যমে সংগঠনটি তাদের ২৫০তম বেওয়ারিশ লাশ দাফন সম্পন্ন করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের মধ্যপাড়া শান্তিবাগের বাসিন্দা, তরুণ প্রকৌশলী মো. আজহার উদ্দিন করোনাকালে ২০২০ সালে বেওয়ারিশ লাশ দাফনের জন্য “ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর” নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পরে ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি তিনি মাত্র ১২জন যুবককে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ করেন।
পরে সংগঠনটির সদস্যরা মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই বেওয়ারিশ লাশ দাফন ও অজ্ঞাতনামা রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করেন।
শহরের পূর্ব মেড্ডা সার গুদাম সংলগ্ন তিতাস নদীর পাড়ে একটি জায়গায় বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়। এটি এখন বেওয়ারিশ লাশের কবরস্থান হিসেবে পরিচিত।
সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা শুধু বেওয়ারিশ লাশ দাফনই নয়, বিনামূল্যে গরিব ও অসহায় রোগীদের রক্তদান, অক্সিজেন সেবা, ওষুধ কিনে দেয়াসহ রোগীদেরকে বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে কোনো অজ্ঞাতনামা লাশ আসলেই হাসপাতাল থেকে “ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর” এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. আজহার উদ্দিনকে খবর দেয়া হয়। সংগঠনের সদস্যরা বেওয়ারিশ লাশের গোসল, কাফন, জানাজা ও দাফনের সব ব্যবস্থা করে।
এ ব্যাপারে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোঃ আজহার উদ্দিন জানান, সম্পূর্ণ মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই, তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অর্থায়নে তার সংগঠনের মাধ্যমে তিনি বেওয়ারিশ লাশ দাফন ও গরিব-অসহায় রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম করেন।
তিনি জানান, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতাল বা পুলিশের কাছ থেকে ফোন পেলেই তারা বেওয়ারিশ লাশ দাফনের ব্যবস্থা করেন। প্রতিটি লাশ ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পুলিশের আবেদনের ভিত্তিতে দাফন কার্যক্রম করা হয়। দাফনের আগে কাফনের কাপড়, বাঁশ, চাটাইসহ প্রয়োজনীয় সকল কাজ শেষ করে ইসলামী বিধান অনুযায়ী জানাজা সম্পন্ন করে লাশ দাফন করা হয়।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, লাশ দাফনের স্থানটি নিচু হওয়ায় বর্ষা ও ঝড়-বৃষ্টি হলে জায়গাটি পানিতে তলিয়ে যায়। তখন লাশ দাফনে মারাত্মক সমস্যা হয়। তিনি বলেন, কবরস্থানটি সংস্কারের জন্য জেলা প্রশাসক ও পৌর সভার নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একাধিকবার আবেদন করলেও এখনো কোন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন বা পৌরসভার পক্ষ থেকে কবরস্থানে কিছু মাটি ফেললেই জায়গাটি উচু হয়ে যাবে। তখন লাশ দাফনে কোন সমস্যা হবেনা।
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) এম. এম. রকীব উর রাজা জানান, চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে নিঃস্বার্থভাবে বেওয়ারিশ লাশ দাফনের এমন মানবিক উদ্যোগ আগে কখনো দেখেননি।
তিনি বলেন, এ ধরনের মহৎ কাজ সত্যিই বিরল। বেওয়ারিশ লাশের দাফনে “ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর” নিঃস্বার্থভাবে কাজ করছে। এটি নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ।
উল্লেখ্য, সড়ক দুর্ঘটনা, ট্রেনে কাটা, পানিতে ডুবে মারা যাওয়া, লাশ অনেক সময় অর্ধগলিত লাশও বেওয়ারিশ হিসেবে শনাক্ত হয়। পরে এসব লাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের সদস্যরা দাফন করে।
আজকালের খবর/বিএস