
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি)-এর উপ-উপাচার্য ও কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহানের বিরুদ্ধে সাইটেশন জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। গুগল স্কলারে নিজের প্রোফাইলে অন্য গবেষকদের প্রবন্ধ যুক্ত করে কৃত্রিমভাবে সাইটেশন সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে তিনি উপ-উপাচার্য পদ লাভ করেছেন—এমন অভিযোগ ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সাইটেশন প্রায় দুই হাজার, এখন ৩২৬-
অভিযোগে বলা হয়েছে, উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগের প্রাক্কালে ড. হেমায়েত জাহানের গুগল স্কলার প্রোফাইলে সাইটেশন সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৯৬০-এ পৌঁছায়। তবে নিয়োগের পর তার আগের প্রোফাইলটি মুছে যায় এবং বর্তমানে বিদ্যমান প্রোফাইলে মাত্র ৩২৬টি সাইটেশন দেখা যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগ, পদোন্নতি ও গবেষণা অনুদান নির্ধারণে সাইটেশন সংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে কৃত্রিমভাবে সাইটেশন বাড়ানোর অভিযোগ গবেষণা জগতে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে দেখা হয়।
অন্য গবেষকের প্রবন্ধ যুক্ত করার অভিযোগ-
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগে ভালো গবেষণা প্রোফাইলকে অগ্রাধিকার দেয়। সে সময় উপাচার্য হওয়ার প্রয়াসে ড. হেমায়েত জাহান নিজের গুগল স্কলার প্রোফাইলে নামের মিল থাকা বিদেশি গবেষকদের প্রবন্ধ যুক্ত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে অস্ট্রেলীয় গবেষক Sayka Jahan (S Jahan)-এর একাধিক গবেষণা প্রবন্ধ তার প্রোফাইলে যুক্ত করা হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এসব সাইটেশনের ভিত্তিতেই ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর তিনি উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান।
এর আগে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপ-উপাচার্য ও উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বেলাল হোসাইনের বিরুদ্ধে সাইটেশন জালিয়াতির অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি আলোচনায় আসে। এরপরই ড. হেমায়েত জাহান তার প্রোফাইল থেকে অন্যদের প্রবন্ধ সরিয়ে নেন বলে জানা যায়।
অভিযুক্তের বক্তব্য-
অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় ড. হেমায়েত জাহান বলেন, স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির কারণেই অতিরিক্ত সাইটেশন যুক্ত হয়ে থাকতে পারে। পরবর্তীতে বিষয়টি নজরে এলে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রোফাইলে সাইটেশন বৃদ্ধির বিষয়টি তার খেয়ালেই আসেনি।
গবেষকদের প্রতিক্রিয়া-
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক ড. মো. গুলজার হোসেন বলেন, গুগল স্কলার অটো-এনাবল থাকলে অন্যের আর্টিকেল যুক্ত হতে পারে। তবে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করলে গবেষক সহজেই দেখতে পারেন কোন আর্টিকেল যুক্ত হয়েছে। পদ-পদবি পাওয়ার উদ্দেশ্যে অন্যের সাইটেশন নিজের প্রোফাইলে রেখে দেওয়া বড় ধরনের অনিয়ম।
তিনি আরও জানান, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে গুগল স্কলার সংশ্লিষ্ট আইডি বন্ধ করে দিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. এম শহিদুল ইসলাম বলেন, এত অল্প সময়ে সাইটেশন সংখ্যায় এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রশ্নবিদ্ধ। এ ধরনের গবেষকদের আমরা ‘সিউডো সায়েন্টিস্ট’ বলি। যদি ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে পদ লাভ করা হয়ে থাকে, তবে সরকারি বিধি অনুযায়ী পদাবনতির সুযোগ রয়েছে।
আগের বিতর্কও আলোচনায়-
অধ্যাপক হেমায়েত জাহানকে ঘিরে এর আগেও বিভিন্ন বিতর্ক রয়েছে। জানা যায়, ২০০৬ সালে তিনি কীটতত্ত্ব বিভাগে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী তিনি এগ্রোফরেস্ট্রি বিভাগে আবেদন করেছিলেন। এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব ও ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সব মিলিয়ে সাইটেশন জালিয়াতির অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে নতুন করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
আজকালের খবর/বিএস