ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্স ২০২২-২৩ (স্নাতক ২০১৮-১৯) শিক্ষাবর্ষের ফলাফল প্রকাশে অযৌক্তিক বিলম্ব, ভাইভা, স্ক্রুটিনি ও ট্যাবুলেশন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক অধিকার হরণের অভিযোগ উঠেছে বিভাগের শিক্ষাকদের বিরুদ্ধে। বুধবার (৪ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর লিখিত এক পত্রে অভিযোগের বিষয়ে জানানো হয়।
অভিযোগপত্র সূত্রে, পরীক্ষা শেষের এক মাসের মধ্যে ফল প্রকাশের কথা থাকলেও গত ৭ ডিসেম্বর পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও মার্চ মাস পর্যন্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত ফল প্রকাশের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বারবার বিভাগীয় সভাপতির সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হন। একইভাবে পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক দিলশাদ সুরমাও একাধিকবার আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ক্রমাগত আশ্বাস ও বিলম্ব তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্যরা তাদের সাথে সরাসরি আলোচনায় এড়িয়ে যাচ্ছেন এবং ফল প্রকাশে বিলম্বের দায় একে অপরের ওপর চাপাচ্ছেন। পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের মধ্যে ব্যক্তিগত বিরোধ ও মতবিরোধ রয়েছে। একাধিক দলে বিভক্ত হয়ে পড়ায় তারা সমন্বিতভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যার সরাসরি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা জানান, দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক অবহেলার কারণে তারা উচ্চশিক্ষা, চাকরি ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকেই নির্ধারিত সময়সীমা পার করে ফেলছেন, কেউ চাকরির সুযোগ হারাচ্ছেন, আবার কেউ উচ্চশিক্ষার আবেদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ইতোমধ্যে ৭ বছর পেরিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা মানসিক, একাডেমিক ও পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এক টিচার ভাইভাতে টপার ফেল করাচ্ছে, এক টিচার অনুপস্থিত ও আরেক স্যার প্রশাসনিক জটিলতা দেখাচ্ছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, স্ক্রুটিনি (নম্বর যাচাই ও সংশোধন) ও ট্যাবুলেশন (নম্বর একত্র করে ফল প্রস্তুত) প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও অ্যাকাডেমিক মানদণ্ড বজায় রাখা হয়নি। শিক্ষার্থীদের দৃঢ় ধারণা— ভাইভা ও লিখিত উত্তরপত্র মূল্যায়নে পক্ষপাতমূলক আচরণ করা হয়েছে এবং সামগ্রিক ফলাফলেও অস্বাভাবিকভাবে কম নম্বর প্রদান করা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে কিছু নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
ভাইভা পরীক্ষার বিষয়ে অভিযোগ করে শিক্ষার্থীরা জানান, চার সদস্যবিশিষ্ট পরীক্ষা কমিটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পৃথকভাবে ভাইভা গ্রহণ করেছেন এবং অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এক মিনিটেরও কম সময় ব্যয় করেছেন। একটি এম.এ. প্রোগ্রামে দীর্ঘ কয়েক বছরের অধ্যয়ন, গবেষণা ও প্রস্তুতিকে এভাবে মূল্যায়ন করা শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক পরিশ্রমের প্রতি চরম অবমূল্যায়ন।
এ প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য বরাবর চারটি দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো—জরুরি ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা, দ্রুত ফল প্রকাশে স্বচ্ছ ও ন্যায্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, ভাইভা-স্ক্রুটিনি ও ট্যাবুলেশন প্রক্রিয়ায় অভিযোগকৃত অনিয়ম যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরীক্ষা কমিটির অভ্যন্তরীণ বিভাজন, দায়িত্বহীন আচরণ ও ধারাবাহিক মিথ্যা আশ্বাস প্রদানের বিষয়ে কার্যকর হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করা।
উপাচার্যের অনুপস্থিতিতে তাঁর পিএস ও উপ-রেজিস্ট্রার গোলাম মাহফুজ অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন। তিনি জানান, ‘ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ দিয়ে গেছে। আমি ভিসি স্যারকে দিয়ে দিচ্ছি। উনি দেখে ব্যবস্থা নিবেন।’
পরীক্ষা কমিটির দায়িত্বে থাকা সহযোগী অধ্যাপক দিলসাদ সুরমা বিভাগে বেশিরভাগ সময় অনুপস্থিত থাকেন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিকরাও অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও সংযোগ পাননি। তবে এর আগে একই অভিযোগে কল দিলে তিনি বিষয়টা অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
এদিকে ভাইভা বোর্ডে টপার ফেল করানোর অভিযোগ উঠেছে সহযোগী অধ্যাপক ড. আজরান আজমীর কাফিয়ার বিরুদ্ধে। জানতে চাইলে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য জানান, ‘এ বিষয়ে তিনি জানে না এবং পরীক্ষা কমিটির সভাপতি বিস্তারিত বলতে পারবেন।’
অভিযোগের বিষয়ে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. শাহাদাৎ হোসেন আজাদ বলেন, ‘আমার জানা মতে পরীক্ষা কমিটি ফলাফল রেডি করেছে এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসে সাবমিট করতেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা কমিটি বলতে পারবেন।
কাওছার আল হাবীব/আজকালের খবর