বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) দুই শিক্ষককে অপসারণ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অব্যাহতি পাওয়া শিক্ষকেরা হলেন, সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর ও সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এস এম মোহসীন।
রবিবার (১৮ জানুয়ারি) এই দুই শিক্ষককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির জনসংযোগ কর্মকর্তা সাদিক হাসান পলাশ। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের দাবি ছিলো, অপসারণ করতে হবে। গতকাল তা বাস্তবায়ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।”
অব্যাহতি পাওয়া এই দুই শিক্ষকের মধ্যে সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর বিশ্ববিদ্যালয়টির বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক (সমাজবিজ্ঞান) পদে ছিলেন। আর ড. এ এস এম মোহসীন একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে পালন করতেন।
জানা গেছে, ধর্ম অবমাননা ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সফট দোসর আখ্যায় তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে, নিজেদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এই দুই শিক্ষক। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন মহলের একটি প্রভাবশালী অংশ এই কাজটি করেছিয়েছেন।
শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্দোলনের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করে চাপের মুখে দুই শিক্ষককে অপসারণ করতে বাধ্য করা হয়। বেশ কিছুদিন ধরে তাদের টার্গেট করে আন্দোলনের নামে ‘মব’ সৃষ্টি করা হয়।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর ক্লাসে ‘সোশ্যাল হিস্ট্রি’ পড়ান। ওই পাঠে বিভিন্ন ধর্মের উদ্ভব ও বিকাশ নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই বিষয়টি নিয়েও জলঘোলা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের এক অংশ ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুললেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশেষ কোনও পক্ষের হয়ে তাকে ফাঁসাতে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তার অপসারণ দাবি করা হয়।
দু’জন শিক্ষককে অব্যাহতি দেওয়ার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষার্থী বলেন, “শিক্ষার্থীর পরিচয় নিশ্চিত করতে একজন শিক্ষার্থীর নেকাব খুলতে বলা হয়েছে বলে কিছু শিক্ষার্থী দাবি করছেন। তবে, নেকাব খোলার অভিযোগ তুলে লাভ হবে না, সে কারণে হিজাব খুলতে বলার অভিযোগ তুলে ওই শিক্ষককের অপসারণ দাবি করা হয়।”
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়টির সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমাকে অপসারণে ইউএপির ডানপন্থি শিক্ষার্থীরা আমার বিরুদ্ধে মব-সন্ত্রাস চালাচ্ছে। ‘মুখঢাকা গৃহকর্মী কর্তৃক মোহাম্মদপুরের জোড়াখুনের ঘটনা’র প্রেক্ষিতে গত ১০ ডিসেম্বর আমার এক ফ্রেন্ডস ফেসবুক পোস্ট দেয়। এই বিষয়কে পুঁজি করে আমার ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন কিছু শিক্ষার্থী অনলাইনে আমাকে নানারকম হুমকি দেয়। তারা আমার নামে কুৎসা রটাতে থাকে। তার প্রেক্ষিতে ইউএপির ভিসি আমাকে গত ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগপত্র পাঠানোর মৌখিক নির্দেশ দেন। পরদিন আমি ভিসি, প্রোভিসি, বোর্ড অফ ট্রাস্টিজের চেয়ারপারসননসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে বসি ও তদন্তের মৌখিক আবেদন করি। ফলশ্রুতিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নতুন করে অভিযোগ আহ্বান করে ও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তারপরও ছাত্রদের কিছু ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ থেকে আমার বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং অব্যাহত থাকে ও আমাকে ‘ইসলাম-বিদ্বেষী’ ট্যাগ দেওয়া হয়। আমার ধারণা, এই ছাত্রদের ঘুঁটি হিসেবে চালাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন মহলের একটি প্রভাবশালী অংশ।”
ধর্ম অবমাননার ট্যাগ দেওয়া নিয়ে লায়েকা বশীর গত ১৭ জানুয়ারি নিজ ফেসবুকে লিখেছেন— ‘‘মুখ ঢাকা বিষয়ে পূর্বের পোস্টে যা লিখেছিলাম, তা ব্যক্তির নিরাপত্তার জায়গা থেকে ভেবে লিখেছি। এখানে কাউকে ছোট করা বা ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে পোশাক পরাকে প্রশ্ন করা হয়নি। মোহাম্মদপুরের জোড়া-খুনের ঘটনার পর দেশের একজন নাগরিক হিসেবে এটি আমার ব্যক্তিগত মত ছিল। এর সাথে আমার কর্মস্থল ইউএপি-র কোনও সম্পর্ক নেই। এটি নিয়ে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি দুঃখজনক। কারও অনুভূতিতে আঘাত লাগলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’’
ধর্ম অবমাননার বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘মোহাম্মদপুরের জোড়া-খুনের ঘটনার পর দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমি ফেসবুকে লিখেছে। এটি আমার ব্যক্তিগত মত। আমার কর্মস্থলের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। অথচ আমাকে ‘ধর্ম অবমানা’র ট্যাগ দিয়ে মব সৃষ্টি করে আমার অপসারণ চাওয়া হয়েছে।’’
সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এস এম মোহসীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমাকে কেন অব্যাহিত দেওয়া হয়েছে আমি সঠিক জানি না। এখনও অব্যাহতির পত্র পাইনি। শুনেছি আমি নাকি আওয়ামী লীগের দোসর। বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের নামে মবসৃষ্টি করে অব্যাহতি চাওয়া হয়েছে।”
সূত্রে জানা গেছে, এই শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পক্ষে সফট কথা বলেছেন। তাই আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানায় শিক্ষার্থী। শিক্ষাার্থীর দাবির মুখে তাকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা সম্প্রতি উপাচার্যকে অপসারণেরও দাবি করেছিল। সেই দাবি থেকে সরে এসে প্রথমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে লায়েকা বশীরের অপসারণ দাবি করেন সাবেক কিছু শিক্ষার্থী। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়টির একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এস এম মোহসীনের পদত্যাগ দাবি করেন।
জানা গেছে, কয়েকমাস আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযোগ কমিটির কনভেনার হিসেবে যৌন হেনস্তার একটি ঘটনার তদন্ত ও শাস্তির প্রস্তাবনা দেন লায়েকা বশীর। বিষয়টি নিয়ে যৌন নিপীড়ক এবং অন্যায় সমর্থনকারী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই শিক্ষিকার ওপর নাখোশ হয়। এরপর থেকেই তাকে টার্গেট করা হয়েছে। লায়েকা বশীর বলেন, “যৌন নিপীড়নের ঘটনায় আমি শাস্তির প্রস্তাব করেছিলাম। জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থেকে আমি ভূমিকা রেখেছিলাম, যা অনেকের ঈর্ষার কারণ হয়ে থাকতে পারে। আমি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা ভেবে গত বছর ২২ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করি।”
আজকালের খবর/ এমকে