বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় জাতীয় নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার লড়াই নয়—এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সার্বিক পরীক্ষা। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই পরীক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যেখানে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনী, বহুবার সংকটকালীন পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা বাহিনী হিসেবে রাষ্ট্রকে সহায়তা করেছে। তবে গণতন্ত্রের সাথে তাদের সম্পর্কটি সূক্ষ্ম, দায়িত্বসচেতন এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালিত।
নির্বাচনকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রধান দায়িত্ব পুলিশ, র্যাব ও আনসার বাহিনীর হলেও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে সহায়ক শক্তি হিসেবে সেনাবাহিনীকে প্রায়ই মাঠে নামানো হয়। এর কারণ, জনগণের একটি বড় অংশ সেনাবাহিনীকে নিরপেক্ষ, সংগঠিত ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনী হিসেবে দেখে। ভোটকেন্দ্র রক্ষা, গুজব নিয়ন্ত্রণ, সহিংসতা প্রতিরোধ, সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে টহল—এসব কাজে তাদের সুসংগঠিত সক্ষমতার প্রমাণ অতীতে বহুবার মিলেছে। বিশেষত ২০০৮ সালের নির্বাচন সেনাবাহিনীর পেশাদার ভূমিকার একটি দৃষ্টান্ত। ত্রয়োদশ নির্বাচনেও তাদের ভূমিকা হবে একই—সহায়ক, নিরপেক্ষ এবং আইনানুগ কাঠামোর ভেতর সীমাবদ্ধ।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্মরণ রাখা প্রয়োজন: বাংলাদেশের সংবিধান সেনাবাহিনীকে সরাসরি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেয়নি; বরং তাদের ভূমিকা “সিভিল প্রশাসনকে সহায়তা” পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। এর উদ্দেশ্য হলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে রাখা এবং সামরিক প্রভাবের সম্ভাব্য ঝুঁকি প্রতিহত করা। যে কোনো পেশাদার সামরিক বাহিনীর মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও এই সাংবিধানিক সীমারেখার ভিতরে থেকেই রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করে আসছে।
নির্বাচনে তাদের উপস্থিতির আরেকটি মানসিক প্রভাব রয়েছে—এটি ভোটারদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করে। নির্বাচন সামনে রেখে সাইবার বিভ্রান্তি, ভুয়া প্রচারণা, সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা কিংবা সন্ত্রাসী তৎপরতা—এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সেনাবাহিনী একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা ছাতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চল, সীমান্তবর্তী জেলা ও সহিংসতা–সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে তাদের ভূমিকা শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণে সহায়ক হতে পারে। একইসঙ্গে, তাদের উপস্থিতি রাজনৈতিক দলগুলোকেও সংযত ভূমিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
কিন্তু গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন হলো—সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা কি বাড়ছে, কমছে, নাকি পরিবর্তিত হচ্ছে? বাস্তবতা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা যত বেশি, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নির্ভরশীলতা তত বেশি। বিরূপ রাজনৈতিক পরিবেশ, অবিশ্বাস, সংঘাতমুখী প্রচারণা—এসব কারণ সেনাবাহিনীকে বারবার মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় করে তোলে। অথচ আদর্শ গণতন্ত্রে নির্বাচন হলো পুরোপুরি বেসামরিক প্রশাসনের পরিচালিত একটি উৎসব, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী কেবল ব্যাকআপ সাপোর্ট দেয়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কঠিনতর হয়েছে, রাষ্ট্রব্যবস্থায় চ্যালেঞ্জ বেড়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকিও বিস্তৃত হয়েছে। এই বৃহত্তর নিরাপত্তা পরিমণ্ডলে সেনাবাহিনীর দায়িত্বও বিস্তৃত হয়েছে—দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান—এসব ভূমিকা তাদের প্রতি জনগণের আস্থা আরও বাড়িয়েছে।
তবে গণতান্ত্রিক দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনী যেন কোনোভাবেই ‘কেন্দ্রীয় অভিনেতা’ হয়ে না ওঠে। ইতিহাস বলে, যখন রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতায় ব্যর্থ হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়, তখন সামরিক বাহিনীর ওপর চাপ বেড়ে যায়। এ চাপ প্রতিষ্ঠানকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে ফেলে। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মানজনক দূরত্ব বজায় থাকা গণতন্ত্রের স্বার্থে অত্যাবশ্যক।
ত্রয়োদশ নির্বাচনে সেনাবাহিনী যে ভূমিকা নেবে তা হবে মূলত—স্থায়ী শান্তি বজায় রাখা, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সমর্থন প্রদান। প্রযুক্তিগত নজরদারি, মোবাইল টিম, দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল গঠন—এসব কার্যক্রম নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। তবে তাদের হস্তক্ষেপ হবে প্রয়োজনের সর্বনিম্ন পর্যায়ে; এটি পেশাদারিত্বেরই অংশ।
অতএব, বাংলাদেশের গণতন্ত্র শক্তিশালী করার প্রকৃত উপায় হলো রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরকে গ্রহণযোগ্যতা দেওয়া, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা বৃদ্ধি করা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সশস্ত্র বাহিনী এই কাঠামোর সহায়ক শক্তি, বিকল্প নয়। তাদের পেশাদার চরিত্র, নিরপেক্ষ অবস্থান ও সংবিধানমাফিক দায়িত্ব পালন গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল রাখার অন্যতম ভিত্তি।
লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আজকালের খবর/