বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ড হতে পারে, কিন্তু বিশ্ব শান্তির বেদীতে এই দেশটির অবদান আজ হিমালয়সদৃশ উচ্চতায় আসীন। গত ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সুদানের আবীয়ি অঞ্চলে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন নিরাপত্তা বাহিনীর (UNISFA) ওপর যে বর্বরোচিত ড্রোন হামলায় শাহাদাত বরণকারী ছয়জন বাংলাদেশি বীর সন্তানের রক্ত কেবল নীল হেলমেটকেই রঞ্জিত করেনি, বরং বিশ্ব শান্তির ইতিহাসে বাংলাদেশের নামকে আরও একবার অমর করে দিয়েছে। নাটোরের মাসুদ রানা থেকে কুড়িগ্রামের শান্ত মন্ডল এই নামগুলো কেবল ব্যক্তিগত পরিচয় নয়, এগুলো আজ বিশ্ব মানবতার প্রহরী হিসেবে বাংলাদেশের অটল সংকল্পের প্রতীক।
সুদানের তপ্ত মরুভূমিতে আধুনিক সমরাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের সৈনিকেরা যে বীরত্ব দেখিয়েছেন, তা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গৌরবময় অথচ বেদনাদায়ক অধ্যায়। এই হামলায় কেবল সামরিক সদস্যরাই নন, বরং মেস ওয়েটার জাহাঙ্গীর আলম এবং লন্ড্রি কর্মচারী সবুজ মিয়ার মতো সাধারণ অসামরিক কর্মীরাও প্রাণ দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের প্রতিটি সদস্য, চাই তিনি সম্মুখ সমরে থাকুন বা লজিস্টিক সাপোর্টে, সমান ঝুঁকি ও দেশপ্রেম নিয়ে কাজ করেন। এই আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শান্তির মূল্য কখনও সস্তা নয়; এটি অর্জিত হয় রক্ত ও নিঃস্বার্থ সেবার বিনিময়ে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই গৌরবোজ্জ্বল অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধ বিরতি পর্যবেক্ষণে মাত্র ১৫ জন সামরিক পর্যবেক্ষক প্রেরণের মধ্য দিয়ে। সেই ক্ষুদ্র চারাগাছটি আজ দীর্ঘ ৩৭ বছরে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ১৯৮৯ সালে নামিবিয়ায় প্রথম শহীদের রক্ত ঝরার পর থেকে আজ অবধি ১৭৪ জন (ডিসেম্বর ২০২৫ এর তথ্য অনুযায়ী) বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্ব শান্তির জন্য প্রাণ দিয়েছেন। এই রক্তদানের পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, এটি একটি জাতির নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে যে মর্যাদা ভোগ করছে, তার পেছনে রয়েছে হাজারো সেনাসদস্যের শ্রম, ঘাম এবং বিদেশের মাটিতে নাম না জানা শত্রুর বিরুদ্ধে অকুতোভয় লড়াইয়ের গল্প।

আমাদের সৈনিকেরা আজ কঙ্গো থেকে হাইতি, মালি থেকে সুদান পর্যন্ত শান্তির দূত হিসেবে কাজ করছেন। তাত্ত্বিকভাবে বলতে গেলে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে তার 'ওয়ারিয়র ফেস' বা যোদ্ধা সত্তার চেয়ে 'সোশ্যাল ফেস' বা সামাজিক ও মানবিক সত্তাকে অধিক প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর এই মানবিক আচরণই তাদের অন্যান্য দেশের শান্তিরক্ষীদের থেকে আলাদা করেছে। শান্তিরক্ষী হিসেবে আমাদের সাফল্যের স্বাক্ষর কেবল বন্দুকের নলে সীমাবদ্ধ নয়; তা ছড়িয়ে আছে অবকাঠামো উন্নয়ন ও মানবিক সেবায়।
সিয়েরা লিওনে গৃহযুদ্ধোত্তর শান্তি ফেরাতে বাংলাদেশি সেনাদের অবদানের কথা বিশ্ব কখনও ভুলবে না। যার স্বীকৃতিস্বরূপ তারা 'বাংলা' ভাষাকে তাদের সম্মানসূচক রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছিল। দক্ষিণ সুদানের রাজধানীর রাজপথ যখন 'বাংলাদেশ রোড' নামে অভিহিত হয়, তখন তা কেবল একটি রাস্তা থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে দুই দেশের হৃদয়ের সেতুবন্ধন। ডিআর কঙ্গোতে আমাদের চিকিৎসকেরা যখন দুস্থ মানুষের সেবা দেন কিংবা মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রে (CAR) যখন 'তুয়াদেরা কমিউনিটি ক্লিনিক' নির্মাণ করে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার মানচিত্র বদলে দেন, তখন বিশ্ববাসী দেখে এক ভিন্ন বাংলাদেশীয় সেনার অবয়ব—যিনি একদিকে রক্ষক, অন্যদিকে সেবক।
শান্তি রক্ষা মিশনে আমাদের নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ বিশ্বব্যাপী লিঙ্গ সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নিরাপত্তার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ২০১০ সালে হাইতিতে বিশ্বের প্রথম মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে অল-ফিমেল পুলিশ ইউনিট পাঠিয়ে বাংলাদেশ যে নজির স্থাপন করেছিল, তা আজও প্রশংসিত।
আবীয়ি হামলায় করপোরাল আফরোজা পারভিন ইতি এবং সৈনিক চুমকি আক্তারের মতো নারী সদস্যদের আহত হওয়া প্রমাণ করে যে, শান্তি রক্ষা মিশনে নারীরা কেবল প্রশাসনিক কাজে সীমাবদ্ধ নন, তারা সম্মুখ সারিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছেন। তবে ২০২৫ সালের এই আবীয়ি ট্র্যাজেডি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও কাজ করছে।
ড্রোন হামলা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নির্দেশ করছে যে, শান্তিরক্ষার পরিবেশ আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও প্রাণঘাতী। বিদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো এখন অনেক বেশি প্রশিক্ষিত এবং প্রযুক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের শান্তিরক্ষীদের সুরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, উন্নত ইন্টেলিজেন্স সক্ষমতা এবং অ্যান্টি-ড্রোন টেকনোলজির সরবরাহ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বুঝতে হবে যে, যারা বিশ্ব শান্তির জন্য নিজেদের জীবন বাজি রাখছেন, তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদান করা বিশ্ব সংস্থারই নৈতিক দায়িত্ব।
আবীয়ির কাদুগুলি লজিস্টিক বেসে যে রক্ত ঝরেছে, তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের 'সফট পাওয়ার' বা মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও এর মানবিক ক্ষতি অপূরণীয়। শহীদদের পরিবারগুলোর প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা রইল। তারা কেবল তাদের আপনজনকে হারাননি, বাংলাদেশ হারিয়েছে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের।
কিন্তু এই বীরদের প্রস্থান বৃথা যাবে না। লাল-সবুজের পতাকাকে নীল হেলমেটের নিচে ধারণ করে আমাদের সৈনিকেরা বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে শান্তির যে চারা রোপণ করছেন, তার ফল ভোগ করবে আগামী দিনের পৃথিবী। সুদানের বালুকাময় মরুভূমিতে মাসুদ রানা, মমিনুল ইসলাম বা শামীম রেজাদের যে রক্ত মিশে গেছে, তা বিশ্ব শান্তির বৃক্ষকে আরও সজীব ও শক্তিশালী করবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশ্ব শান্তিতে যে গৌরবান্বিত স্বাক্ষর রেখে চলছে, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, এক শান্তিকামী জাতির মানবতার তরে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের অমর আখ্যান হিসেবে।
বিশ্ব আজও অস্থির। যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, জাতিগত সংঘাত ও সন্ত্রাসবাদ থামেনি। এমন এক বাস্তবতায় শান্তিরক্ষীদের প্রয়োজন আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবিষ্যতেও এই দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত থাকবে, এটাই আমাদের ঐতিহ্য। তবে এই প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শান্তিরক্ষা মানে নিরস্ত্র আত্মত্যাগ নয়, তাদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে সম্মান ও সুরক্ষা। শহীদের বিদেহী আত্মা শান্তি পাক এবং তাদের আত্মত্যাগ বিশ্বকে আরও নিরাপদ ও শান্তিময় করে তুলুক, এটাই আজ একান্ত প্রার্থনা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
আজকালের খবর/ এমকে