বাংলাদেশের সামাজিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতায় মাদক ও রোহিঙ্গা ইস্যু এখন আর বিচ্ছিন্ন দুটি বিষয় নয়; বরং ক্রমেই তা একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে যুক্ত হয়ে উঠছে। মাদক চোরাচালান, সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সংকট ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে এই দুটি ইস্যু দেশের জন্য বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ধরন ও বিস্তৃতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইয়াবা, হেরোইন, আইস ও সিনথেটিক ড্রাগের সহজলভ্যতা সমাজের সর্বস্তরে নীরব ধ্বংস ডেকে আনছে। বিশেষ করে তরুণ ও কিশোর সমাজ মাদকের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে, আর কক্সবাজার–টেকনাফ এলাকা এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এখানেই রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে মাদকের যোগসূত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০১৭ সালের পর থেকে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হলেও এর অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শরণার্থী শিবিরগুলোর আশপাশে অপরাধমূলক তৎপরতা, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক বাণিজ্যের বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই উঠে আসছে। যদিও সব রোহিঙ্গাকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা অন্যায় ও অমানবিক, তবুও কিছু সংঘবদ্ধ চক্র যে এই অসহায় জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করে মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, তা বাস্তবতা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
মাদক ব্যবসায়ীরা রোহিঙ্গা সংকটকে একটি ‘সফট স্পট’ হিসেবে দেখছে। সীমান্তের জটিল ভূপ্রকৃতি, সমুদ্রপথ, নাফ নদী এবং জনবহুল শরণার্থী শিবির—সব মিলিয়ে এটি চোরাচালানের জন্য তুলনামূলক সহজ পথ তৈরি করেছে। দরিদ্রতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা রোহিঙ্গা যুবকদের একটি অংশকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখানে দায় কেবল শরণার্থীদের নয়; বরং দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, যারা টেকসই সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
মাদক ও রোহিঙ্গা ইস্যুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতীয় নিরাপত্তা। মাদক বাণিজ্য শুধু সামাজিক অবক্ষয়ই সৃষ্টি করে না, এটি সন্ত্রাসবাদ ও সংগঠিত অপরাধের অর্থায়নের উৎস হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। সীমান্ত এলাকায় মাদকের প্রভাব বৃদ্ধি পেলে তা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে দুর্বল করে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপ বাড়ায়। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে শরণার্থীদের সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ে, যা সামাজিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করে।
এই সংকট মোকাবিলায় একমাত্র দমনমূলক নীতি যথেষ্ট নয়। অবশ্যই মাদক চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। তবে একই সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে থাকা একটি জনগোষ্ঠীকে শুধু নজরদারির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না; তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ন্যূনতম আশা দিতে হয়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারে নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসন ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মাদক উৎপাদন ও পাচার রোধে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি। এককভাবে বাংলাদেশের পক্ষে এই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন, যদি প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা না নেয়।
সবশেষে বলতে হয়, মাদক ও রোহিঙ্গা ইস্যু আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখলে বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র ধরা পড়বে না। এই দুটি বিষয় পরস্পরকে প্রভাবিত করছে এবং একে অন্যকে আরও জটিল করে তুলছে। মানবিক দায়িত্ব ও জাতীয় স্বার্থ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কঠোরতা ও সহানুভূতির সমন্বিত নীতিই পারে সমাজকে মাদকের অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে এবং রোহিঙ্গা সংকটকে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হওয়া থেকে ঠেকাতে। রাষ্ট্র যদি এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়, তবে এই দ্বিমুখী সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আজকালের খবর/ এমকে