বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংকট এবং আস্থাহীনতার পর এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার শুরু থেকেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নির্বাচন পেছানোর গুজব ও নানা ষড়যন্ত্রের মধ্যেও নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা এবং তা বাস্তবায়নে সরকারের অনড় অবস্থান ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। অতীতে নির্বাচন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ও সময়ক্ষেপণের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, বর্তমান সরকার সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে—যা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য আশাব্যঞ্জক।
নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমেও একটি প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা লক্ষ করা যাচ্ছে। মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, আপিল ও প্রতীক বরাদ্দ—সব ধাপ নির্ধারিত নিয়মে এগিয়ে চলছে। সরকার সরাসরি কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ না করার নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছে, যা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।
প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগও বর্তমান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। পোস্টাল ভোটে অংশগ্রহণের পরিসর আশানুরূপ, তবু এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। প্রবাসী নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলবে—এ বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছা স্পষ্ট।
নির্বাচনের পাশাপাশি অর্থনীতির প্রশ্নেও সরকার বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছে। গত দেড় বছরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার উপলব্ধি করেছে যে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। একটি বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই পারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং অর্থনীতিকে সচল করতে।
এই কারণেই বর্তমান সরকার নির্বাচনকে কেবল সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কৌশলগত উপাদান হিসেবেও দেখছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংলাপ, মানবাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বিষয়ে উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সংস্কার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার বার্তা—সব মিলিয়ে সরকার একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় আচরণের দৃষ্টান্ত রাখার চেষ্টা করছে।
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘ভোটের গাড়ি’ কর্মসূচিতে দেওয়া বক্তব্য সরকারের রাজনৈতিক দর্শনকে আরও স্পষ্ট করেছে। ভোটারদের ‘দেশের মালিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, তরুণ ও প্রথমবারের ভোটারদের অংশগ্রহণে উৎসাহ এবং ভোটাধিকারকে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করা—এসবই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এই বক্তব্য কেবল প্রতীকী নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি প্রয়াস।
তবে এটাও সত্য যে, এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখনো সামনে। একটি বড় রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতার প্রশ্নে বিতর্ক রয়ে গেছে। তবু এটাও অস্বীকার করা যায় না যে, বর্তমান সরকার অন্তত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে আন্তরিক চেষ্টা করছে।
সবশেষে বলা যায়, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বর্তমান সরকারের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। যদি সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে, তবে তা শুধু গণতন্ত্রের পথ সুগম করবে না, বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তিও শক্ত করবে। এই নির্বাচনই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ সংকটের বৃত্তে আটকে থাকবে, নাকি একটি নতুন গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।
আজকালের খবর/ এমকে