বুধবার ৭ জানুয়ারি ২০২৬
ভারতীয় মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারণা ও বাংলাদেশের করণীয়
আব্দুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৮:৪৮ পিএম
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন নেতিবাচক প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংস ঘটনাকে ভিত্তি করে একতরফা সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে দেশটিকে একটি অস্থিতিশীল ও সংখ্যালঘু-বিদ্বেষী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে চিত্রিত করার চেষ্টা চলছে। এই প্রচারণা কেবল সাংবাদিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের মূলে আঘাত করছে।

পশ্চিমবঙ্গের মালদহ, কোচবিহার ও শিলিগুড়ি জেলার হোটেল মালিকদের সংগঠন ঘোষণা করেছে যে বাংলাদেশি নাগরিকদের আর তাদের হোটেলে থাকার অনুমতি দেওয়া হবে না। হোটেলের সামনে বাংলাদেশিদের প্রবেশ নিষেধ নোটিশ টাঙানো হয়েছে, যা গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। হোটেল মালিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভিসা কার্যক্রম স্থগিত থাকায় এবং সে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি অনিশ্চিত হওয়ায় তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাস্তবে এটি কোনো ভারতীয় সরকারি সিদ্ধান্ত নয়; বরং কিছু বেসরকারি সংগঠনের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত অবস্থান। তবু গণমাধ্যমে বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন এটি ভারতের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতিফলন। এই সিদ্ধান্তের ফলে চিকিৎসা, শিক্ষা ও মানবিক কারণে ভারতে আসা বাংলাদেশিরাও চরম ভোগান্তির মুখে পড়ছেন, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী।

বাংলাদেশে সংঘটিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনাকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে হিন্দু নিধন বা ধর্মীয় গণহত্যা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে এগুলো পৃথক পৃথক ফৌজদারি অপরাধ, যেগুলোর তদন্ত চলছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাগুলোকে সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় নিধনের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা বাস্তবতাকে অতিরঞ্জিত করে। অপরাধ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পদক্ষেপগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদে উপেক্ষিত থাকছে।

ফরিদপুরে জেমসের কনসার্ট বাতিল হওয়ার ঘটনাকে ভারতীয় গণমাধ্যমে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর মৌলবাদী আক্রমণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যদিও স্থানীয় প্রশাসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এটি ছিল ভিড় ও নিরাপত্তাজনিত একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। একটি বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক ঘটনায় প্রশাসনিক ত্রুটিকে পুরো রাষ্ট্রের ব্যর্থতা হিসেবে দেখানো একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান তৈরির ইঙ্গিত দেয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশে গঠিত বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (BMJP) কে ঘিরে প্রচার সাধারণ সংবাদ পরিবেশনের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। দলটিকে প্রায়শই বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের “একমাত্র কণ্ঠস্বর” হিসেবে তুলে ধরে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে একটি ধারণা তৈরি করা হচ্ছে যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে নতুন এই দলই একমাত্র বিকল্প। পাশাপাশি ভারতের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের পরোক্ষ আহ্বান এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ ছড়ানোর প্রবণতাও লক্ষ করা যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি একটি আন্তর্জাতিক বয়ানে রূপ পাচ্ছে, যা দেশের বহুদলীয় বাস্তবতা ও সার্বভৌম রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা সৃষ্টি করছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি ও বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন—জানুয়ারিতে পাঁচ লক্ষ হিন্দু সাধু নিয়ে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনে অভিযান চালাবেন। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর “নির্যাতন” বন্ধ না হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ভারতীয় গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ এই ধরনের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী বক্তব্যকে কঠোর সমালোচনা না করে বরং 'ন্যায্য প্রতিবাদ' হিসেবে প্রচার করছে, যা সরাসরি দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনাকে উসকে দিচ্ছে।

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতা স্পষ্ট। ভারতীয় সংবাদে বলা হচ্ছে, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, সংখ্যালঘুরা নিরাপদে ভোট দিতে পারবে না এবং রাজনৈতিক সহিংসতা অনিবার্য।

পর্যটন ও চিকিৎসা খাতের ক্ষেত্রে হোটেল বয়কট এবং ভিসা জটিলতার ফলে ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি বাংলাদেশের পর্যটন খাত নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ায় বিদেশি পর্যটকদের আগমনে ভাটা পড়তে পারে। রপ্তানি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের সিংহভাগই উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের স্থলবন্দরের ওপর নির্ভরশীল। চলমান উত্তেজনায় সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে।

আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ভারতীয় গণমাধ্যমের ইংরেজি সংস্করণগুলো বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের একটি 'অস্থিতিশীল' চিত্র তুলে ধরছে। এর ফলে ইউরোপ-আমেরিকার মতো দেশগুলো বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা জিএসপি সুবিধা বা বিদেশি বিনিয়োগের জন্য হুমকিস্বরূপ।

সীমান্তের ওপার থেকে আসা তীব্র উস্কানি বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ভারত-বিরোধী মনোভাব তৈরি করতে পারে। এটি দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার একটি 'ট্র্যাপ' বা ফাঁদ হিসেবে কাজ করতে পারে, যা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

২০২৬ সালের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। এতে একটি বিশেষ পক্ষকে 'সংখ্যালঘু রক্ষক' এবং অন্য পক্ষকে 'মৌলবাদী' হিসেবে চিহ্নিত করে জনমতের ওপর প্রভাব ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ডেডিকেটেড সেল গঠন করা, যা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে ভারতীয় প্রচারণার ভুলগুলো ধরিয়ে দেবে এবং সঠিক তথ্য (ভিডিও ও ডকুমেন্টসহ) প্রচার করবে।
নিয়মিতভাবে বিদেশি দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে নিয়ে ব্রিফিং আয়োজন করা। গত কয়েক মাসে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় সরকার কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তার একটি 'হোয়াইট পেপার' বা শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। 

চিকিৎসা ও পর্যটনের জন্য এককভাবে ভারতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চিন, নেপাল, থাইল্যান্ড এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ট্রাভেল কানেক্টিভিটি বাড়ানো।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় বাংলাদেশের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য ইনফ্লুয়েন্সার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করা।

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে (যেমন উপ-হাইকমিশনে হামলার হুমকি), তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় তার বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিবাদের পথ উন্মুক্ত রাখা।

রাজনৈতিক উস্কানির প্রতিক্রিয়ায় দেশের অভ্যন্তরে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে লক্ষ্যে গোয়েন্দা নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় ও সহনশীল সংস্কৃতিকে বৈশ্বিক মিডিয়ার মাধ্যমে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা।

ভারত- বাংলাদেশ সম্পর্কের স্থিতিশীলতা কেবল দুই দেশের জন্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্যই জরুরি। ভারতীয় গণমাধ্যমের বর্তমান নেতিবাচক প্রবণতা একটি সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে, তবে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশকে এই পরিস্থিতিতে আবেগী প্রতিক্রিয়ার পথে না গিয়ে তথ্যনির্ভর, ধৈর্যশীল এবং কূটনৈতিকভাবে বলিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতিই এই সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

আজকালের খবর/










http://ajkalerkhobor.net/ad/1751440178.gif
সর্বশেষ সংবাদ
জকসুর ২৩ কেন্দ্রের ফল ঘোষণা, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি, জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রিতে নজর পাকিস্তানের
দেশের ৩৫ জেলায় শনাক্ত নিপাহ ভাইরাস, আইইডিসিআরের সতর্কবার্তা
শহীদদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরদিন লিপিবদ্ধ থাকবে : প্রধান উপদেষ্টা
হলফনামায় গরমিল নিয়ে সারজিসের ব্যাখ্যা
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
বিপিএলের উপস্থাপনা প্যানেল থেকে বাদ ভারতীয় উপস্থাপিকা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির কম্বল বিতরণ
সাতক্ষীরায় পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খামারিদের নিয়ে উঠান বৈঠক
ভেনেজুয়েলার পর ট্রাম্পের নজর যে ৫ দেশ ও অঞ্চল ওপর
নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ ছড়ানোদের নজরদারিতে রেখেছে সরকার: প্রেস সচিব
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft