শনিবার ৪ এপ্রিল ২০২৬
পার্বত্য শান্তি চুক্তিঃ কাগজে সাফল্য, বাস্তবে অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১১:০৮ পিএম   (ভিজিট : ৬৮২)
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার পথে নানা সংকট তৈরি হলেও সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সংবেদনশীল সমস্যার একটি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিতিশীলতা। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পরিচয়, অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি ধীরে ধীরে রূপ নেয় সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকে এই সংকটকে স্থানীয় অসন্তোষ বা বৈষম্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখালেও সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে—পার্বত্য অঞ্চলের উত্তেজনা কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, বরং গভীরভাবে যুক্ত আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক গতিবিধির সঙ্গে। 

বিশেষ করে ভারতের স্বার্থ ছিল দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে চাপ ধরে রেখে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করা। স্বাধীনতার পর থেকেই পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো “আদিবাসী” পরিচয়ে আলাদা রাষ্ট্র বা বিস্তৃত স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলে। ১৯৭০–৮০ এর দশকে তারা অস্ত্র সংগ্রহ করে শক্তিশালী হতে থাকে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে ভারত তাদের অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও আশ্রয় দিয়েছে—উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে চাপের মধ্যে রাখা এবং অস্থিতিশীলতার পরিবেশ স্থায়ী করা।

অন্যদিকে বাংলাদেশকে এই সশস্ত্র বিদ্রোহ মোকাবিলায় একাধিকবার কঠোর অভিযানে যেতে হয়েছে, যেখানে সেনা, পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা প্রাণ দিয়েছেন। সাধারণ মানুষও বছরের পর বছর অস্থিরতা, ভয় ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে জীবন কাটিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার নতুনভাবে আলোচনার উদ্যোগ নেয়, যার ফলশ্রুতিতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষর হয় পার্বত্য শান্তি চুক্তি—যাকে দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চুক্তির লক্ষ্য ছিল অস্ত্রবিরতি, স্থায়ী স্থিতিশীলতা, আস্থার পরিবেশ তৈরি, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ ও উন্নয়নকে গতিশীল করা। কিন্তু ২৮ বছর পর প্রশ্ন উঠেছে—এই চুক্তি থেকে বাংলাদেশ আসলে কী পেল? আমরা কি সত্যিই সেই কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারলাম?

চুক্তিতে চারটি ভাগে প্রায় ৭০টি ধারা অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেখানে বলা হয়—পাহাড়ে বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামো গঠন হবে, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কমিশন কাজ করবে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র জমা দেবে, সেনা ক্যাম্প কমানো হবে এবং পাহাড়ি–বাঙালিদের সমঅধিকার নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে চুক্তির এই প্রতিশ্রুতিগুলোর ব্যবধান রয়ে গেছে বিরাট। ভূমি কমিশন কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেনি, প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের বেশির ভাগ অংশই কাগজে-কলমে থেকেছে, সশস্ত্র গ্রুপগুলো পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ হয়নি; বরং সময়ের সঙ্গে নতুন নতুন গ্রুপ জন্ম নিয়েছে, যারা আবারও পুরো অঞ্চলকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শান্তি চুক্তির পর আশা ছিল পরিস্থিতি বদলাবে, কিন্তু গত এক দশকের ঘটনাপ্রবাহ দেখায়—পাহাড়ে নতুন গ্রুপ সৃষ্টি হয়েছে, চাঁদাবাজি, অপহরণ, অস্ত্র পাচার বেড়েছে, বাঙালি–পাহাড়ি উত্তেজনা তীব্র হয়েছে এবং বিদেশি গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ আরও গভীর হয়েছে। বোঝা যায়, শুধু চুক্তি সই করলেই শান্তি আসে না; শান্তি টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, ন্যায়ভিত্তিক আইন প্রয়োগ এবং বিদেশি প্রভাব মোকাবিলা করার সক্ষমতা—যেখানে আমরা দুর্বল ছিলাম।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন—ভারত পার্বত্য ইস্যুকে “স্ট্র্যাটেজিক লেভারেজ” হিসেবে ব্যবহার করে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, কক্সবাজার উপকূল, উত্তর–পূর্ব ভারতের করিডোর, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিসহ নানা কৌশলগত কারণে ভারত সবসময় চাইত সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলটিতে নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা বজায় থাকুক। অভিযোগ রয়েছে, আজও বিভিন্ন পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থ, অস্ত্র, লজিস্টিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক আশ্রয় পায়। এই বহিরাগত হস্তক্ষেপ চুক্তিকে বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ ছিল সেনা উপস্থিতি কমানো। আশা করা হয়েছিল—সেনা কমালে আস্থা তৈরি হবে এবং স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি সামলাতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টোটা। সেনা ক্যাম্প কমানো মাত্রই বহু এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বেড়ে যায়। “আঞ্চলিক সশস্ত্র ব্যবসা”—চাঁদাবাজি, অপহরণ, অস্ত্র পাচার—অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পায়। সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, কৃষক—সবার উপর বাড়তে থাকে চাপ, ভয় ও অনিশ্চয়তা। স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তার এই শূন্যতা কোনোভাবেই পূরণ করতে পারেনি। আজ জনমতের একটি বড় অংশ, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় মানুষের দাবি—পাহাড়ে আবারও সেনা উপস্থিতি জোরদার করা ছাড়া বিকল্প নেই। কারণ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা কোনো চুক্তির চেয়েও বড় বিষয়, এবং আইন–শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।

চুক্তির পর আশা করা হয়েছিল—পাহাড়ি জনগোষ্ঠী দেশের মূলধারার সঙ্গে আরও সংযুক্ত হবে। কিন্তু বাস্তচিত্র তেমন নয়। পাহাড়ি গোষ্ঠীগুলোর একটি অংশ আজও নিজেদের “আলাদা জাতিগত সত্তা” দাবি করে, সংবিধানকে মানতে চায় না, অনেক এলাকায় বাঙালিদের প্রতি বৈরী মনোভাব বজায় রয়েছে, হামলা–উচ্ছেদ–হুমকির ঘটনাও থামেনি। প্রশ্ন উঠছে—চুক্তি কি সত্যিই আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছে? প্রাপ্ত উত্তর হতাশাজনক।

২৮ বছর পর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রাপ্তি খুব সীমিত—কাগুজে শান্তি, রাজনৈতিক প্রচারণা, কিছু উন্নয়ন কার্যক্রম, কিন্তু বাস্তবে পাহাড় এখনো রয়ে গেছে অস্থির, বিভক্ত ও দুর্বল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে। নতুন সশস্ত্র গ্রুপগুলোর উত্থানই প্রমাণ করে সমস্যার মূল জায়গাগুলো অমীমাংসিত আছে। তাই এখন প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি—পাহাড়ে সেনা উপস্থিতি জোরদার করা, ভারতের বেআইনি প্রভাব বন্ধ করা, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, ভূমি কমিশনকে কার্যকর করা এবং বাঙালি–পাহাড়ি বৈষম্য দূর করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।

শান্তিচুক্তিকে একসময় “ঐতিহাসিক সাফল্য” বলা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবতা বলছে—পার্বত্য চট্টগ্রাম আজও অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে। বিদেশি স্বার্থ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর পুনর্সংগঠন এবং দুর্বল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তাই প্রশ্নটা আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—চুক্তি কি সত্যিই শান্তি এনেছে, নাকি “শান্তি” নামের আড়ালে আমরা আরও অস্থিতিশীলতাকে সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়েছি? দেশের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডেও অশান্তি থাকতে পারে না—এই নীতিই এখন রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। চুক্তি থাকুক বা না থাকুক, পাহাড়ে দৃঢ় রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি এখন অপরিহার্য, কারণ সার্বভৌমত্বই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা।

লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


আজকালের খবর/ এমকে









Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
খালেদা জিয়ার শেষবিদায়ে দায়িত্বশীল সবার প্রতি তারেক রহমানের কৃতজ্ঞতা
পুঠিয়ায় বাজারে বালুবাহী ট্রাক উল্টে নিহত ৪
কুড়িগ্রাম শহরে নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীরের পোস্টার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থী আটক
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
বিশ্ব মিডিয়ায় খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর
সোনালী ব্যাংক ম্যানেজারের বিরুদ্ধে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগ
খালেদা জিয়ার জানাজা বুধবার দুপুর ২টায় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft