আকাশের উঠোনে একখণ্ড চাঁদ। চারদিক জ্যোৎস্নার আলোতে এক মন মাতানো পরিবেশ। এমন সময় ঘর থেকে বেরিয়ে আসে মুনিয়া। উঠোনে এসে ধীরলয় হাঁটার ফাঁকে ফাঁকে জ্যোৎস্নার আলো সর্বাঙ্গে মাখছে। মনে মনে বলছে আর হাসছে কী সুন্দর জ্যোৎস্না রাত্রি। আজ আকাশটা কী দারুণ লাগছে! জ্যোৎস্না রাত্রিতে মুনিয়ার হাঁটাহাঁটি দেখে পাশের বাড়ির বান্ধবী, শ্যামলীও এসে তার সাথে যোগ দিল।মুনিয়া বলল, শ্যামলী এসেছো? দেখো অনেকক্ষণ ধরে একা একা হাঁটছি।
তোমার হাঁটাহাঁটি দেখে আমি কি আর থাকতে পারলাম? তাই চলে আসলাম।
ভালোই হলো এসে, এখন দুজনে মিলে গল্প করবো আর হেঁটে হেঁটে জ্যোৎস্না মাখবো।
আজ রাত্রিটা দারুন লাগছে তাই না শ্যামলী?
এটা কী আর বলতে হয়, অবশ্যই ভালো লাগছে। চতুর্দিকে আলো আর আলো দেখে যেনো মনে হয় ভাদ্রের পূর্ণিমা রাত্রি! আকাশে কোথাও সাঁঝের দেখা নেই, আকাশটা একদম পরিষ্কার।
শ্যামলী বলল, আচ্ছা মুনিয়া তোর খবরটা কিরে? মুনিয়া একটু চিন্তিত হয়ে বলল, কোন খবরটা!
আরে কবীর ভাইয়ের খবর। এই কথাটা বলার সাথে সাথে মুনিয়ার মনটা একদম খারাপ হয়ে গেল। এতক্ষণ যার মনটা ছিল প্রফুল্ল, আর এখন অমাবস্যায় তার আকাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার! ঝিম ধরে বসে পড়ল চেয়ারে।
শোন শ্যামলী, তুইতো আমার সব কিছুই জানিস, আমাদের পরিবারের সবাই জেনে গেছে কবীরের সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক। আমি এখন মহা বিপদে আছি! গতকাল সারারাত এক ফোঁটাও ঘুম হয়নি, কেঁদেছি শুধুই কেঁদেছি! আব্বু-আম্মু কবীরের কথা শুনে ভীষণ ক্ষেপেছেন! জানি না আমার ভাগ্যে কী আছে! আম্মু আমাকে বলেছে ছেলেটি মেট্রিক পাস, তা ছাড়া সে গরিব! আর তুই বিএ পড়ছিস, আমরা কি গরিব? তোর বাবা ভূসম্পত্তির মালিক। এই অঞ্চলে আমরা একটি নামিদামি সম্ভ্রান্ত পরিবার। সবাই আমাদের সম্মান করে আর তোর সর্ম্পক এই একটি গরিব ছেলের সাথে! তোরে কি জন্ম দিয়েছি আমাদের মুখে চুনকালি দিতে? তোর স্বপ্ন কখনোই পূরণ হবে না। আর যদি বেশি কিছু ভাবিস-তাহলে তোকে টুকরো টুকরো করে নদীতে ভাসিয়ে দিবো। তুই কি মনে করলি?
আম্মার কথায় কোনো জবাব দেইনি, শুধু চুপ করে শুনেছি।
তুই কি বললি? আম্মুর মুখে-মুখে কিছুই বলিনি, শুধু চুপ করে থেকেছি।
তাহলে তুই এখন কী করবি? কী করবো যে আমি এখন নিজেই ভেবে পাচ্ছি না! আব্বু আমার মোবাইল ফোনটা ভেঙে ফেলেছে!
মুনিয়া বলল, তোর সাথে কি কবীরের দেখা হয়?
হয় মাঝে মাঝে, গতকাল কথা হয়েছিল।
সে কী বললো?
কী আর বলবে, তোর কষ্টের কথা শুনে চোখের জল ফেলল ।
শোন শ্যামলী, আমার তো আর কিছুই করার নেই। কোনো পথঘাট খোলা নেই। শুনেছি আমাকে নাকি বিয়ে দিয়ে দিবে।
তুই কী বললি?
আমি আর কী বলবো, বলেছি আমি এখন বিয়ে করবো না।
রূপা কলেজে যাবার পথে, হঠাৎ একদিন কবীরের সাথে দেখা।
কেমন আছো রূপা?
জি ভাইয়া ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন? আমি বেশি ভালো নেই! গরিব মানুষ কী আর ভালো থাকতে পারে? যাই হোক, মুনিয়ার খবর কী? বেশ কিছুদিন ধরে মুনিয়াকে কলেজে যেতে দেখি না! কী হয়েছে ওর?
রূপা বলল, মুনিয়া এখন গৃহবন্দি! কলেজ আসা যাওয়া বন্ধ। মুনিয়ার আব্বু আম্মু কলেজে আসা যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। শুনেছি মুনিয়ার বড় ভাই নাকি রাজনৈতিক নেতা, ঢাকা থেকে বাড়ি আসছে। মুনিয়ার সাথে নাকি ওর বড় ভাই বোঝাপড়া করবে। শুনেছি মুনিয়ার বড় ভাই নাকি ভয়ঙ্কর মানুষ! দেইখেন কবীর ভাই, আপনি ওর সামনে পড়বেন না। একটু চোখ কান খোলা রেখে চলবেন। কেননা যেকোনো মুহূর্তে আপনার বিপদ হতে পারে! আজ তাহলে চলি, আচ্ছা যাও।
রূপার কথা শুনে কবীরের মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। মাথার চুল টানতে টানতে রহমত ভাইয়ের চায়ের দোকানে এসে বসল। নীরব নিথর মনে চুপচাপ বসে আছে। কে শুনে তার নদী ভাঙনের কথা। কবীরের মনে কেন জানি আজ প্রফুল্লতা নেই। এমন সময় কবীরের কয়েকজন বন্ধু চা-খেতে দোকানে আসলো। হাসান বলল, কিরে কবীর একা একা কী ভাবছিস? নিশ্চয়ই মুনিয়ার কথা। এভাবে মন গম্ভীর করে বসে থাকিস না। কথা বল, তোর কী হয়েছে। আমরাও না হয় একটু শেয়ার করি। কী বলেন রহমত ভাই?
হ, ঠিহই কইছ।
হাসান বলল, রহমত ভাই আমাদের চা দেন।
চা কয়ড্যা দিমু?
দেননা পাঁচ-ছয়টা। কিরে কবীর কথা বলছিস না যে? আজ দোকান খুলবি না?
হ-রে হাসান, একটু পরে দোকানে যাব।
কবীর বলল, চায়ের টাকাটা আমি দিয়ে দেই।
আরে না তুই দিবি কেনো? আমি দিবো, তুই দোকানে যা।
বিকালে তুই আমার দোকানে আসিস। তোর সাথে আমার জরুরি কিছু কথা আছে।
আচ্ছা ঠিক আছে। রহমত ভাই চায়ের টাকাটা নেন, আজ তাহলে চলি।
পরের দিন, হাসানের সাথে কামরুলের দেখা বাড়ি ফিরার সময়।
কামরুল বলল, এই হাসান একটু দাঁড়া।
কেনো কী ব্যাপার?
মুনিয়ার বড় ভাই, নেতা লিটন খান বাড়িতে এসেছে? এইমাত্র শুনলাম মুনিয়াকে নাকি বেধড়ক মারধর করছে! মুনিয়ার মুখ দিয়ে নাকি রক্ত এসে গেছে! মুনিয়াকে ঈশ্বরগঞ্জ মেডিক্যাল থেকে রেফার করে ময়মনসিংহ মেডিক্যালে পাঠানো হয়েছে?
হাসান বলল, তাহলে তো ভীষণ বিপদ! খবরটা তো কবীরকে জানাতে হয়।
কামরুল বলল, তাহলে খবরটা কবীরকে জানিয়ে আয়। আমি বাড়ি থেকে আসছি।
আর শোন হাসান, কবীরকে বলিস একটু সাবধানে থাকতে, আচ্ছা ঠিক আছে।
নেতা লিটন খান কিছুক্ষণ পরেই তার দলবল নিয়ে কবীরের দোকানে যায়। কিন্তু কবীরকে দোকানে না পেয়ে, রাগে বকাবকি করতে থাকে। শালারে পাইলে আজ হাড়গোড় ভেঙে ফেলতাম। কই গেলি ফকিন্নির বাচ্চা, সামনে আয় দেখি, এক্কেবারে নাক-চোখ তুলে ফেলবো। জীবনে আর যেনো কাউকে দেখতে না পারিস। আজকে বাইচ্চা গেলি, এই হুমকি দিয়ে তারা চলে গেলো। পাশের দোকানের কয়েকজন কবীরকে লুকিয়ে রেখেছিল, কবীরকে তারা আসতে দেয়নি। কারণ কবীরকে পেলে ওরা সবাই মিলে মারতো। কবীর ওই সব লোকদের অশ্লীল গালিগালাজ নিজ কানে শুনতে পেল; যা তার মনকে আরো বিষণ্ন করে তুলে। কবীর আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলেন। হে আল্লাহ তুমি মুনিয়াকে সুস্থ করে দাও। কবীরের দু’চোখের জল গাল বেয়ে মাটিতে পড়ছে। এবং বলছে, তাদের তো অনেক কিছুই আছে খোদা, আমার তো কিছুই নেই, আমার মানুষ নেই, লাঠি নেই, এই হলো আমার অবস্থা। তুমি তো সবকিছুই জানো খোদা, তবে কেনো আমাকে কষ্ট দিচ্ছো। আমি তো তোমার কাছে অসহায় এক বান্দা। সবাই ওদেরকে ভয় পায়। মাটি ফাঁক করে দাও খোদা, এর আগে মাটির ভেতরে ঢুকে পড়ি। এই পৃথিবীতে বুঝি গরিবের পাঁচ পয়সার মূল্য নেই। কবীর তার মাথার চুল নিজেই টেনে টেনে ছিঁড়তে লাগলো। আশপাশের সবাই কবীরকে সান্ত্বনা দিতে লাগলো।
মুনিয়ার বান্ধবী সাথী আজ সকালে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল থেকে বাড়ি এসেছে। এই খবর শুনে কবীর সাথীর বাড়িতে গেল। কবীরের সাথে গেল হাসান, বাড়িতে গিয়ে সাথীকে পেল। ওদেরকে দেখে সাথী বলল, কবীর ভাইয়া আমি জানি আপনি আসবেন। কবীর ভাই আপনি কেমন আছেন?
বেশি ভালো না, তুমি কেমন আছো?
জি ভালো আছি।
মুনিয়ার খবর বল, সে এখন কেমন আছে?
মুনিয়া এখন কথা বলতে পারে, এখন মোটামুটি ভালোই আছে। অল্প অল্প করে খেতেও পারে। এখন আর তেমন কোনো অসুবিধা নেই।
মেডিক্যাল থেকে কখন এলে? এইতো ধরেন ঘণ্টা দেড়েক হবে।
কবীর ভাই, মুনিয়াতো এখন শুধু কাঁদে আর কাঁদে। মুনিয়া আমাকে বলেছে তার আর কোনো পথ খোলা নেই। পথের সব দরোজা বন্ধ। পালিয়ে গেলেও ধরে এনে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। তা ছাড়া কবীর আমার জন্য কষ্ট পাক আমি চাই না। সে ভালো থাকুক এটা আমি চাই।
শুনেছি সুস্থ হলেই নাকি ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দিবে। ক্ষণে ক্ষণে আপনার জন্য কাঁদে, কবীর তো সারা জীবন আমাকে স্বার্থপর বলে ডাকবে। আমি যদি কবীরের দিকে পা বাড়াই তাহলে ওরা কবীরকে মেরে ফেলবে। তখন এই সমাজের মানুষের আমাকে কলঙ্কিনী বলে জানবে। তখন তো আমি আমার মুখ দেখাতে পারবো না। আমি মুনিয়াকে সান্ত্বনা দিয়ে এসেছি, তুই কোনো চিন্তা করিস না, পরিস্থিতি শান্ত হোক তারপর দেখ কী হয়। মুনিয়া আমার হাত ধরে বলে দিয়েছে আপনি ওর জন্য কোনো চিন্তা করবেন না। আপনি যেনো ওদের কাছ থেকে একটু দূরে সরে থাকেন, না হয় ওরা আপনাকে মারধর করবে।
কবীরের মনে প্রাণে দুঃখের ঝড়ো হাওয়া তীব্রতর থেকে আরো তীব্রতর হয়ে উঠলো। বেশ কিছুদিন ধরে কবীর তার দোকান খুলে না। এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। ততদিনে তার দাড়ি গোঁফ লম্বা হতে চলছে। অসহায়ের মতো শুধু ঘুরে ফিরে। পরক্ষণে নেতা লিটন খানের কাছে খবর এলো, কবীর রহমতের চা স্টলে বসে আছে।
চল যাই তাহলে, শালা আজ পালাইয়া যাবে কোথায়? ছুটে এলো রহমত ভাইয়ের দোকানে। গিয়ে দেখে কবীর দোকানের এককোণে চুপচাপ বসে আছে। লিটনকে খানকে দেখে কবীর চলে যাচ্ছিলো। হঠাৎ লিটন খান চিৎকার দিলো, ধর শালারে!
ওরা ছয় সাতজন দৌড়ে গিয়ে কবীরকে ধরে মারধর করতে লাগল। লিটন খান এসে বলে, আজ কোথায় যাবি? অনেক নাটক করেছিস, আর করতে পারবি না, এই বলে বাঁশের লাঠি দিয়ে কবীরের মাথায় আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গেই কবীর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং স্মরণশক্তি হারিয়ে ফেলে। তারপর কবীরকে আরো কয়েকটা লাথি মেরে ওরা চলে যায়। আশপাশের লোকেরা দৌড়ে এসে কবীরকে একটি ভ্যানে তুলে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে, কর্তব্যরত ডাক্তার, মাথায় ব্যান্ডেজ করে বলেন, উনার ব্রেনে খুব বেশি রক্তক্ষরণ হয়েছে। কাজেই এ রোগীকে এখানে রাখা যাবে না। খুব দ্রুত ময়মনসিংহে নিয়ে যান। কিন্তু ওরা বলল, সে গরিব মানুষ, এতো টাকা কোথায় পাবে? ডাক্তার সাহেব, ওখান থেকেই একটা ব্যবস্থাপত্র করে দেন। ডাক্তার বলল, আচ্ছা ঠিক আছে; এই ওষুধগুলো খাওয়ান ভালো হয়ে যেতে পারে।
তারপর কবীরকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।
এরপর সুস্থ হয়ে উঠলেও তার ব্রেন আর ভালো হয়নি। সেই থেকে কবীর পাগল হয়ে গেল। তার বন্ধু-বান্ধবেরা টাকা-পয়সা দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছে, কিন্তু এতেও কাজ হয়নি। সকল বন্ধুরা কেঁদেছেন, কবীর কত ভালো বন্ধু ছিলো আমাদের, আজ সে পাগল হয়ে গেল। এরপর থেকে কবীর পাগলা নামে এই সমাজ তাকে গ্রহণ করলো। এরপর প্রায় চার মাস পর মুনিয়ার বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হলো তার মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে। বিয়ের দিন বিকেল বেলা বিয়ের অনুষ্ঠানের খাওয়া-দাওয়ার শেষে, ফেলে দেওয়া পোলাও ভাত, গোশতের হাঁড়গুড় কুড়িয়ে এনে পথের পাশে একটি আম গাছের নিচে বসে চেটেচুটে খাচ্ছে, প্রেমিক কবীর পাগলা। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে কণেকে যখন প্রাইভেটকার দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন ড্রাইভার পথে দেখে অনেক মানুষ দাঁড়ানো, হর্ন দিতে দিতে মানুষেরা একটু সরে দাঁড়াল। তখন দেখে এ সেই কবীর পাগলা। মুনিয়া ঘোমটা একটু তুলে কবীর পাগলাকে দেখার পর বাকশক্তি হারিয়ে প্রাইভেট কারের সিটে পড়ে যায়।
আজকালের খবর/আরইউ