বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; কেবল একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু সমান্তরাল বহে। এ ইতিহাস একদিনে হয়নি। টুঙ্গিপাড়ার খোকা ধাপে ধাপে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন। তাঁর এই বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পেছনে বিশেষ ভূমিকাটি রেখেছে ছাত্রজীবন, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। একটি শিশুর মেধা, মনন, সাহস, বুদ্ধিমত্তা, সততা, মানবিকতা ইত্যাদি গড়ে তোলার পেছনে পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু, স্বজন ও কোনো না কোনো অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রাখে এবং তা ছাত্রজীবনকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট্ট খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠার পেছনেও এই বিষয়গুলো নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এক কথায় বলা যায়, বঙ্গবন্ধুর চেতনা, আদর্শ, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, মানবিকতা ও নেতৃত্বের সকল গুণাবলির বিকাশ ঘটেছে তাঁর ছাত্রজীবনেই।
আমরা বঙ্গবন্ধুকে জানতে এ পর্যন্ত অনেক বই পেয়েছি। তার মাঝে সর্বোচ্চ সহায়ক হিসেবে কাজ করছে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী কিংবা আত্মস্মৃতিমূলক গ্রন্থগুলো। এ ছাড়া অনেক লেখকের নানা গ্রন্থ আমরা পাই। তবে সেসব গ্রন্থের কতগুলো সঠিক তথ্যের নিরিখে লিখিত সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
বঙ্গবন্ধু একদিন বাংলাদেশ জয় করলেন। এর দ্বারা তিনি বিশ্বও জয় করলেন। কীভাবে তিনি এত অবিচল ও সাহসী হওয়ার অনুপ্রেরণা পেলেন? কীভাবে তাঁর এক আঙুলের ইশারায় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হলো? প্রশ্নগুলোর উত্তর কম-বেশি আমাদের জানা। কিন্তু এসব উত্তরের শেকড় যে তাঁর ছাত্রজীবনেই অন্তর্নিহিত সেখানে আমরা খুব কমই আলোকপাত করেছি। ছাত্রজীবনই বঙ্গবন্ধুকে দিয়েছে রাজনীতির প্রাথমিক, প্রকৃত ও গভীর পাঠটি। অথচ এ বিষয়ে ভালো গ্রন্থের অভাব প্রকট। গবেষক-প্রাবন্ধিকদের এ বিষয়ে খুব বেশি আগ্রহও দেখা যায় না। তার কারণ তারা একজন রাজনীতিক বঙ্গবন্ধুকেই কাছ থেকে দেখেছেন। না দেখলেও অন্যের দেখায় তার সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। রাজনীতির মহাকাব্যিক অভিযাত্রায় যে ক্যারিশমাটিক চমক বঙ্গবন্ধু বিশ্ব ইতিহাসে সৃষ্টি করেছেন, তার বিশ্লেষণ ও গবেষণার বিশাল পরিধি এখনো গবেষক-প্রাবন্ধিকদেরকে বঙ্গবন্ধুর শেকড়ের সন্ধানে মনোযোগী হওয়াকে বিলম্বিত করছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন নিয়ে গবেষণা ও চর্চা এখনো তাদের দৃষ্টির বাইরে রয়ে গেছে।
তবে সম্প্রতি এ অভাব পূরণ করেছেন লেখক-গবেষক মো. রিফাত আমিন। তিনি লিখেছেন বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। এবং তা সত্য ও সঠিক তথ্যের সমন্বয়ে। রিফাত আমিন ‘বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন’ গ্রন্থটির দ্বারা এক মলাটে তৎকালিন সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস পাঠককে জানতে সহায়তা করেছেন। বইটিতে শেখ পরিবারে বঙ্গবন্ধুর জীবনপাঠের সূচনা থেকে ছাত্রজীবনের ধাপে ধাপে গোপালগঞ্জ, মাদারিপুরসহ তৎকালীন ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর বিচিত্র শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠার চমৎকার চিত্র ফুটে উঠেছে, তাও সময়ের ধারাবাহিকতাকে ধারণ করে। বঙ্গবন্ধুর হাতেখড়ি থেকে সপ্তম শ্রেণিতে পাঠ বিরতী, কিংবা এন্ট্রান্স পাস থেকে বেকার হোস্টেলে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ জীবন এবং সবশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক চেতনা বিস্ফোরণ সবমিলিয়ে অসাধারণ একটি সুখপাঠ্য আখ্যান গ্রন্থ এটি। শুধু তাই নয়, কেবল সময়ের ধারাবাহিক পরিক্রমায় লেখক নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রতিটি ধাপে যে মানুষগুলো নেপথ্যের কারিগর হয়ে বঙ্গবন্ধুকে গড়ে তুলেছেন তাঁদের ভূমিকাগুলোকেও সূক্ষ্ম কারিগরের মতো বিনিসুঁতোর মালায় গেঁথেছেন লেখক। এই লেখাগুলো পাঠে এ যুগের একজন অভিভাবক, শিক্ষক বা পাঠক আজকের শিশুদের মাঝে আগামীর উজ্জ্বল নেতৃত্ব গড়ে দেওয়ার একটি দিকনির্দেশনা খুঁজে পাবেন, এ কথা অনায়াসে বলা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ১৯৪৯ সালে বহিষ্কার করে। অবশ্য অনেকটা সময় পর ২০১০ সালে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়।
বইটির মুখবন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান লিখেছেন, ‘লেখক খুব সতর্কতার সঙ্গে তথ্য পরিবেশন করেছেন। তা ছাড়া কোনো তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা মনে করলেই লেখক তা অন্য আরেকটি সূত্রের সাথে যাচাই করে তার নিজের মন্তব্য করেছেন।’ দেশের বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ আরো লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু শৈশবকাল থেকেই গৃহশিক্ষকের হাত ধরে দেশপ্রেম ও নৈতিকতার যে শিক্ষা পেয়েছেন, তাই তাঁর মনোজগতে শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের কয়েকটি স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে আইএ ও বিএ পাশ করে ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে স্নাতকোত্তর পাঠের জন্য ভর্তি হন।’
ছাত্রজীবনেই বঙ্গবন্ধু রাজনীতির শিক্ষা গ্রহণ করেন। তার মেধা-মনন-দেশপ্রেম-মানুষের জন্য ভাবনা ছাত্রজীবনের শিক্ষার দ্বারাই পরিপক্কতা পায়। এ ক্ষেত্রে আমরা রিফাত আমিনের বইটিতে লেখা প্রাককথনে নজর দিতে পারি। এই প্রাককথনে তিনি জানান দিয়েছেন কেন তিনি বইটি লিখতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। আরো জানা যাবে, বঙ্গবন্ধুকে তিনি কীভাবে দেখেন। রিফাত আমিন লিখেন, ‘বঙ্গবন্ধুর শৈশব জীবনের পাতায় পাতায় বিচরণ করলে দেখা যায়, সমাজচিন্তা-রাষ্ট্রচিন্তার বীজ বঙ্গবন্ধুর শিশুবেলাতেই তার জীবনে রোপিত হয়েছে। আর সেই বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে তার ছাত্রজীবনে, হয়েছে পত্র-পল্লবে প্রস্ফুটিত।’
লেখক রিফাত আমিন ‘বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন’কে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম ভাগে আছে স্কুলজীবন; যাতে প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর এন্ট্রান্স পাস করা পর্যন্ত সময়ের ধারাবাহিক চিত্র ওঠে এসেছে। ওই সময়ের একটি সমাজচিত্রও মিলবে তাতে।
দ্বিতীয় ভাগে এসেছে কলেজজীবন ও ভারত ভাগ। স্বভাবতই ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধুর কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি পরবর্তী সময় এবং ভারত ভাগ হওয়ার পর দেশে ফিরে আসার সময়টি বলা হয়েছে।
তৃতীয় ভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্ব। এ পর্বে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক বিকাশের এক অনন্য অধ্যায়ের বর্ণনা করা হয়েছে; যা শেষ হয়েছে তাঁর শিক্ষাজীবনের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে। একটি অংশ যুক্ত করা হয়েছে ‘অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়মুক্তির প্রয়াস’।
চতুর্থ ভাগে আছে চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিকাশ। এ ভাগে দুটি নিবন্ধ আছে। পঞ্চম ভাগে আছে ‘অনন্য বঙ্গবন্ধু: ইতিহাসের বাইরে ভিন্ন ইতিহাস’। পাঁচটি নিবন্ধে বঙ্গবন্ধুর খেলাধুলার প্রতি ঝোঁক, শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, বাবার প্রেরণা, বঙ্গবন্ধুর প্রিয় রেণু বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কথা এবং বন্ধুদের বর্ণনায় বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন কেমন ছিল সেই বর্ণনা আছে। বিশেষভাবে একজন বাবা, একজন স্ত্রী, একজন শিক্ষক, একটি পরিবার কেমন করে একজন জাতিস্রষ্টাকে গড়ে তুলতে পারে তার অনবদ্য এক বর্ণনা পাওয়া যাবে এই ভাগে।
গবেষক রিফাত আমিন বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবনের আখ্যান বলতে গিয়ে চমৎকারভাবে অনেকটা গল্পের মতো আরো অনেককিছু বর্ণনা করেছেন। এর মাঝেই এসেছে, বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক জীবন, শেখ পরিবারের কথা, তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের কথা। তাঁর অদ্ভুত, সাহসী ও বর্ণাঢ্য জীবন জানতে বইটি পড়তে হবে। বাংলা ও বাঙালির অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগ-তিতিক্ষার সরল ও সরেস বয়ান মিলবে ‘বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন’ গ্রন্থে। এতে ধরা দিবে বাংলার ইতিহাস। কেমন করে আমরা একজন বঙ্গবন্ধুকে পেলাম। কেমন করেইবা লাল-সবুজের মানচিত্র পেলাম। একটি সবুজ বদ্বীপ ভূখণ্ড কেমন করে প্রকৃতই আমাদের হলো।
পাঠক, একজন কালজয়ী অবিসংবাদিত মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে জানতে, বাংলাদেশকে জানতে বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। সেই ক্ষেত্রে রিফাত আমিন ঈর্ষণীয়, অনবদ্য ও প্রশংসনীয় একটি কাজ করেছেন। ২৮৪ পৃষ্ঠায় বন্দি করেছেন বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবনকে। আর. কে. রুবেলের চমৎকার প্রচ্ছদে অফসেটে ছাপা ঝকঝকে বইটি হতে পারে বঙ্গবন্ধু অর্থাৎ বাংলাদেশকে জানার অনবদ্য দলিল। গৌরব প্রকাশনও এ ক্ষেত্রে সাধুবাদ পাবে; একটি ঐতিহাসিক বই মুদ্রণ করে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছে বলে। অসংখ্য দুর্লভ ছবি সংযুক্ত গ্রন্থটির মূল্য রাখা হয়েছে ৫৪০ টাকা।
বইটির একেবারে শেষে লেখক লিখেছেন, ‘শেখ মুজিব এমন একটি সত্তা, যাঁর জন্ম থেকে মৃত্যু পুরো সময়জুড়ে মিশে আছে বাংলার গ্রাম, প্রকৃতি, মাটি, মানুষ এবং মানুষের অধিকার। অবুঝ শৈশবের সেই ছাত্রজীবনেই তার মানবিক স্ফুরণ আলোকিত করেছে চারপাশ। এরপর বিরতীহীন এগিয়ে চলা। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আমৃত্যু তিনি বিলিয়ে দিয়ে গেছেন দেশ, মাটি ও মানুষের কল্যাণে অবিশ্রান্তভাবে। তাঁর মাঝে খুব সহজভাবে বিকশিত হয়েছে মানবতাবোধ এবং অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। প্রকৃত বিচারে তিনি মানবতার স্বভাবকবি; মহাকালের মহাকবি। জীবনের সূচনালগ্ন থেকে ধাপে ধাপে বিনিসুঁতোর মালায় গেঁথেছেন বাঙালির মুক্তির নকশিকাঁথা। বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন সাধনাকে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন মহাকালের স্বার্থক এক মহানায়ক। ছাত্রজীবন তার সেই অনন্য মহাযাত্রার ভিত্তিভূমি।’
লেখকের শেষ স্বশ্রদ্ধ কথামালা আমাদের বুঝিয়ে দেয় বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টাকে, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে জানতে তাঁর শেকড় জানা কতটা জরুরি, অর্থাৎ ছাত্রজীবন পাঠ করা কতটুকু জরুরি। সর্বশেষ মো. রিফাত আমিন আমাদের ভালোবাসার ডোরে আবদ্ধ হয়ে আছেন এমন ঐতিহাসিক একটি গ্রন্থ লেখার জন্য। নিঃসন্দেহে ‘বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন’ মনন ও মানসে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক শিক্ষাজীবনের দিনলিপি।
আজকালের খবর/আরইউ