‘Poetry is when an emotion has found its thought and the thought has found words’- রবার্ট ফ্রস্টের কথায় এই ইংরেজি টুকুর বাংলা করলে দাঁড়ায়- কবিতা হলো যখন একটি আবেগ তার চিন্তা খুঁজে পেয়েছে এবং চিন্তা শব্দ খুঁজে পেয়েছে। সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কবিতা। অর্থাৎ কবিতার উৎপত্তি আবেগ থেকে। আবেগ হলো সেই অংশ যা আমাদের ভেতরের সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কয়েকটি শব্দে একটি গভীর অংশের উপস্থাপনায় কবিতার বিকল্প নেই। কবি ও কবিতার সম্পর্ক হৃদয় আর স্পন্দনের মতো। কবিতা নিজেই আলোড়িত হয়, আলোড়িত করে। নাড়া দেয় মানব মনের ভেতর থেকে ভেতরে। কবিতার নিজস্ব ভাষাও রয়েছে। কখনো তা যুদ্ধের, কখনো প্রেমের আবার কখনো তা দ্রোহের। জীবনের দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতার উপাদান খুঁজে নেয় কবি। উইকিপিডিয়ায় পাওয়া যায়, কবি সেই ব্যক্তি বা সাহিত্যিক যিনি কবিত্ব শক্তির অধিকারী এবং কবিতা রচনা করেন। একজন কবি তার রচিত ও সৃষ্ট মৌলিক কবিতাকে লিখিত বা অলিখিত উভয়ভাবেই প্রকাশ করতে পারেন। আর বাংলা ভাষার আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। কবি তার হৃদয়ে কাল্পনিক শক্তির অধিকারী হন। অনেকেই বলেন যিনি জগতের একখানি যথাযথ চিত্রপট একে দিতে পারেন তিনিই কবি। বর্তমান সময়ে দেশে বিদেশে প্রচুর বাঙালি সাহিত্য চর্চার এই গুরুত্বপূর্ণ অংশ কবিতা নিয়ে চর্চা করছেন। কবিতা চর্চা এবং কবিতা পাঠের মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করা এই দুইয়ের ভেতর পার্থক্য থেকে যাচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে সাহিত্য সাময়িকীগুলোর একটি অংশজুড়েই থাকছে কবিতা। সে তুলনায় দেশে প্রাবন্ধিক খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। তবে পাঠকের পক্ষ থেকে প্রায়ই একটি অভিযোগ পাওয়া যায় কবিতা নিয়ে। তাদের অভিযোগ এ সময়ের কবিতায় অযথাই কঠিন শব্দের প্রয়োগ হচ্ছে। কবিতা বোধগম্য হতে একটি বেশিই কষ্ট হচ্ছে। এ অভিযোগটি যে একেবারে অমূলক নয় সেটি সমসাময়িক কবিতায় পড়লেই বেশ বোঝা যায়। কবিতা হোক বা প্রবন্ধ হোক বা অন্যকিছু হোক যদি তা সহজে বোঝা না যায় তাহলে তা স্বার্থক সাহিত্যের কাতারে পরে না।
কবিতার গতি প্রকৃতির যারা খোঁজ রাখেন তারাও এটা স্বীকার করবেন। অথচ আমরা যাদের কবি হিসেবে আদর্শ মানি সেই জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হকরা কিন্তু কবিতায় কাঠিন্য আনেননি। কবিতা পড়ার সাথে সাথে তার অর্থ বুঝতে যদি বহু সময় পার হয়ে যায় তাহলে তার পেছনে আর সময় ব্যয় করবে কেন? এখন প্রশ্ন হলো কবিতা যদি এভাবে কাঠিন্যের দিকে ধাবিত হয় তাহলে পাঠকের বিমুখতা তৈরি হবে এবং তা কবিতার জন্য ভালো নয়। যদিও কবিতার ঢং যার যার নিজস্ব। কিন্তু শব্দগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটু সহজবোধ্যতা আশা করতেই পারে পাঠকসাধারণ। আজকাল কবিতা প্রকাশের মাধ্যম বহু। এর মধ্যে কোনটি কবিতা হচ্ছে আর কোনটি কবিতা হচ্ছে না সেটাও বিচার করার কেউ নেই। ইচ্ছে হলেই তা প্রকাশ করা যায়। অন্তত সেক্ষেত্রে ফেসবুক তো রয়েছেই। কবি হতে চাওয়া কোনো অপরাধ নয়। তবে কবিতা লিখতে হলে আগে কবিতা প্রচুর পড়তে হয় এই তত্ত্ব হালের অনেকেই হারিয়ে বসেছেন। একজন কবি প্রতিদিন একের অধিক কবিতাও লিখছেন! প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি কবিতা লেখা এতটাই সহজ? যাদের কবিতা আমরা আদর্শ মানি তারাও কি এত এত কবিতা লিখতেন? অকবিতা নিয়ে আজকাল নানামুখী আলোচনা চোখে পরে। কবি কবিতা এসব নিয়ে সাহিত্যিকরা বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ব্যাখ্যা দেন। এসব ব্যাখ্যার কোনো কোনো অংশ বুঝতে পারি আবার কোনো কোনো অংশ বেশ দুর্বোধ্য বলে মনে হয়। দুর্বোধ্য সম্ভবত আমার অজ্ঞানতার কারণেই। একটি চিত্র যেমন সবাই বুঝে উঠতে পারে না তেমনি একটা কবিতাও সবার বোধগম্য হয় না। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে কবির কবিতা বোঝা যত দুঃসাধ্য কাব্যের মাপকাঠিতে সেটি ততো ভারী! অথচ সত্যি হলো কবিতার দুর্বোধ্য হলে পাঠক তা এড়িয়ে যায়। কবিতা যদি কারো আবেগকে টানতে না পারে তাহলে আর কবিতার সার্থকতা কোথায় থাকে। এই যে বনলতা সেনরা সৃষ্টি হয়েছে সে কী এমনি এমনি হয়েছে। কাব্য বোঝার মতো শব্দঘর আমর ভেতর তৈরি হয়নি। আজকাল কবিতা প্রকাশের সুযোগ বা ক্ষেত্র অনেক বেশি। দেশে হাজারের উপরে জাতীয়, আঞ্চলিক পত্রিকা রয়েছে। দৈনিক পত্রিকার পাশাপাশি রয়েছে সাপ্তাহিক, মাসিক বা ত্রৈমাসিক পত্রিকা। এসব পত্রিকার রয়েছে সাহিত্য পাতা। এসব সাহিত্য পাতায় নিয়মিত কবিতা লিখছেন তরুণ কবিরা। মূলত নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি। এতসব মাধ্যমের ভিড়ে কবিদের নিয়ে নানা সমালোচনাও চোখে পরে।
যতটুকু জানি তা হলো একজন পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদককে কবিতার বাছাইয়ে হিমশিম খেতে হয়। কারণ এই কবিতায় প্রতিদিন তাদের ইমেইলে ভুড়ি ভুড়ি জমা হয়। অথচ বিপরীতে গল্প, প্রবন্ধ জমা হয় একেবারেই কম। মানসম্মত প্রবন্ধ তো হয় না বললেই চলে। একই বিষয় ঘুরে ফিরে উঠে আসছে। নিজস্বতা কমছে। কবিতার এই প্রাচুর্যতা দেখলে এটা ধরেই নেওয়া যায় যে দেশে কবির সংখ্যা অগণিত। আমাদের সবার ভেতর যেহেতু আবেগ আছে সেহেতু আমরা সবাই কবি। কিন্তু একজন প্রকৃত কবি তার আবেগকে শব্দ দিয়ে সাজাতে পারেন যা আমরা পারি না। সত্যি বলতে সবাইকে দিয়ে কবিতা লেখা হয় না বা সবাই কবিতা লিখতে পারেন না। কিন্তু বর্তমান সময়ে সবাই যেন কবি হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। নিজের লেখা কবিতা ছাপানোর সুযোগ বেশি থাকার জন্য মানসম্মত কবি পাওয়া প্রায় দুষ্কর হয়ে পরেছে। অন্যের মেধাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই কিন্তু কবিতার নামে যে কোনো কিছু গ্রহণ করাটাও কবিতার জন্য সুখকর কিছু নয়। কবি নিজেই যখন ফেসবুক বা ব্যানারে নামের আগে কবি শব্দটি যোগ করে বসে থাকেন তখন কবি ও কবিতার অবস্থা নিয়ে শঙ্কিত হতে হয়।
বড় বড় কবি কিন্তু নিজে তার নামের আগে কবি বসিয়ে সাইনবোর্ড বা ব্যানারে ঝুলিয়ে দেননি। আমরা তার নাম বলার সময় কবি শব্দটি ব্যাবহার করি। কাব্য চর্চার পরিধি বাড়ছে তবে পরিধি বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে মানহীন কবিতার সংখ্যা। বইমেলায় প্রতিবছর বহু অচেনা কবির কবিতার বই ছাপা হয়। সেসব কবিতার কবিরা অনেকেই পকেটের টাকা খরচ করে কবিতার বই বের করেন। এই একটা সুযোগ কেবল ছাপার অক্ষরে বই বের করার সুযোগও করে দিচ্ছে। এসব কবিদের কি কখনো আর দেখা যায় না তাদের কতজনের কবিতা পরবর্তীতে আলোচিত হয়। আবার রীতিমতো প্রতিযোগিতার আয়োজনও করছে অনেক আন্তর্জাতিক সাহিত্য সংগঠন। সেখানে প্রতিদিন সেরা কবির সম্মাননাও দিচ্ছে ঘটা করে! আশ্চর্য ব্যাপার হলো তাদের পাঠক সমাজে পরিচিতি নেই! লেখার অর্থ তো সম্মাননা পাওয়া না পাঠকের কাছে পৌঁছানো। সেই চেষ্টাটিই করতে হবে আগে। কবিতা লেখা সহজ কোনো কাজ নয়। কবিদের শব্দভাণ্ডার হবে খুব শক্তিশালী। একসময় কবিদের লেখায় শব্দের গভীরতা যেমন ছিল তেমন ছিল শব্দের ব্যাবহারে বৈচিত্র্যতা। আজকাল যা গদ্য কবিতার যুগে কমই চোখে পরে। কবিতা লিখতে প্রয়োজন হয় সময়ের। আর আমাদের সেই সময় নেই! রবীন্দ্র যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক গদ্য কবিতার যুগ পর্যন্ত বহু কবি কবিতা লিখতে চেষ্টা করে গেছেন। তবে কবিতার ধারা নিয়ে টিকে আছে কতজন কবি? অন্তমিল না থাকলেও যে কোনো লেখা কবিতা হয় তা বুঝতেই তো বহুদিন পার হয়ে গেছে আমাদের। যাই হোক নতুন নতুন কবি আসবে, তাদের হাত ধরে কবিতাও আসবে। তবে মানের দিকটা একটু নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কবিতার গতিপথ নির্ধারিত হতে মানসম্মত কবিতার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আজকালের খবর/আরইউ