গাজীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)তে নবনিযুক্ত মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মো. আমিনুল ইসলামকে ঘিরে তীব্র বিক্ষোভ, কর্মবিরতি এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এই নিয়োগ প্রত্যাখ্যানে আন্দোলনে নেমেছে। অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানজুড়ে বিভক্তি ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সোমবার (৪ মে) সকাল থেকেই ব্রির প্রধান কার্যালয় প্রাঙ্গণে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান দেখা যায়। নিয়োগবিরোধীরা মহাপরিচালকের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে কর্মবিরতি পালন শুরু করে এবং বিভিন্ন দপ্তরেও তালা লাগিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।
বিক্ষোভের সময় ব্রি বিজ্ঞানী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মুকুল অভিযোগ করে বলেন, নতুন ডিজি আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন। প্রশাসনে আধিপত্য কায়েম করে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না। আন্দোলনরত বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকরা একসুরে বলেন, আমরা কোনো দলীয় বা বিতর্কিত ডিজি চাই না। আমরা চাই একজন সৎ, যোগ্য, কৃষিবান্ধব, বিজ্ঞানীবান্ধব এবং শ্রমিক-কর্মচারীবান্ধব ডিজি, যিনি সবার আস্থার প্রতীক হবেন। এবং হুঁশিয়ারি দেন-এই নিয়োগ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে এবং নতুন ডিজিকে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। তাদের দাবি, নবনিযুক্ত ডিজি অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। যা ব্রির মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
অন্যদিকে নিয়োগের পক্ষে থাকা অংশ বলছে। দীর্ঘ এক মাস ডিজির পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম, গবেষণা প্রকল্প ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এমনকি অনেক কর্মচারী সময়মতো বেতন-ভাতা পাননি। তাদের মতে সরকার নিয়ম মেনেই নিয়োগ দিয়েছে এবং দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে।
নবনিযুক্ত ডিজি ড. মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, এখানে কোনো পক্ষ থাকার কথা নয়, একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক বিভাজনের কোনো সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, আমি সবাইকে নিয়ে বসতে চাই। আলোচনা করে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করতে হবে, এটি হয়তো ভুল বোঝাবুঝি। সরকারি আদেশ অনুযায়ী এই নিয়োগ হয়েছে। তাই বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত। আর আমার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ তোলা হয়েছে তার সঠিক নয়।
উল্লেখ্য, গত এক মাস ধরে ডিজির পদ শূন্য থাকায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটটের প্রশাসনিক কার্যক্রম, গবেষণা, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানে স্থবিরতা দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে সরকার নতুন ডিজি নিয়োগ দিলেও তা কার্যক্রম সচল করার বদলে নতুন করে সংঘাত সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে ব্রি প্রাঙ্গণে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গবেষণা কার্যক্রম, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। যা দেশের কৃষি গবেষণা ও খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যবেক্ষকদের মতে সংকটের কেন্দ্রবিন্দু এখন নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থার প্রশ্ন, একদিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অন্যদিকে পেশাজীবীদের আপত্তি-এই দ্বন্দ্ব নিরসনে দ্রুত সংলাপ, স্বচ্ছতা এবং গ্রহণযোগ্য সমাধানই হতে পারে একমাত্র পথ।
আজকালের খবর/বিএস