দেশের বন্ধ হয়ে পড়া কলকারখানাগুলো পর্যায়ক্রমে পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সরকার গঠনের পরপরই শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বন্ধ কারখানাগুলোর তালিকা প্রণয়ন এবং বন্ধ হওয়ার কারণ অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২ মে) দুপুরে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নে বাসিয়া নদী পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন শেষে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধাপে ধাপে সব বন্ধ কলকারখানা চালু করা হবে। প্রয়োজনে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়েও সেগুলো সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এর মাধ্যমে দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি জানান, নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনে দেশের শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি, বন্ধ হয়ে থাকা বিদেশি শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই জনশক্তি রপ্তানি স্বাভাবিক হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাসিয়া নদী পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, জলাবদ্ধতা কমবে এবং এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা পাবে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদী খনন করা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা। সরাসরি উপকৃত হবেন ৮০ থেকে ৯০ হাজার কৃষক এবং পরোক্ষভাবে উপকৃত হবেন আরও প্রায় দেড় লাখ মানুষ। প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমি নতুন করে চাষের আওতায় আসবে। বছরে অতিরিক্ত সাত হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া নদীর দুই তীরে ৫০ হাজার গাছ রোপণের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধন শেষে তিনি নদীর তীরে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের ৬০ জেলায় খাল খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মোকাবিলা করা হবে। নদী দূষণ রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিরও আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১২ লাখ কৃষকের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। কৃষকদের সার, বীজ ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় নেতাদের জন্য ভাতা চালু করা হয়েছে।
সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত ১১টি জটিলতা ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। খুব শিগগিরই কাজ শুরু হবে। এছাড়া ঢাকা-সিলেট রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতে তিনি জানান, সিলেটের পরিত্যক্ত ২০০ শয্যার হাসপাতাল দ্রুত চালু করা হবে। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ১২০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার ৮০ শতাংশই নারী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সিলেটের আইটি পার্ক দ্রুত সচল করা হবে। একই সঙ্গে ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো আধুনিকায়ন করা হবে, যাতে তরুণরা দক্ষতা অর্জন করে সহজে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।
সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাড়ে চার বছর আগে আমিনুল (ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক) লন্ডনে গেলে তার সাথে রেস্টুরেন্টে বসে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের ব্যাপারে প্রথম আলাপ হয়। এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নেই ক্ষমতায় এলে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ চালু করবো।
শিশু কিশোরদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, সরকার থেকে আমরা আমাদের সামর্থ দিয়ে ছোট্টবন্ধুদের পাশে আছি। তা হোক লেখাপড়া বা খেলাধুলার। তোমরা যারা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, খেলোয়াড়, গায়ক, মিউজিশিয়ান- যে যা হতে চাও, সরকার তোমাদের সহযোগীতা করবেঅ।। যে গান শিখতে চায়, সে গান শিখবে, যে মিউজিশিয়ান হতে চায়, সে মিউজিশিয়ান হবে, সেই ব্যবস্থা আমরা করবো।
অনুষ্ঠানে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক স্বাগত বক্তব্য রাখেন।
বক্তৃতা পর্ব শেষে অনলাইনে সারাদেশে একযোগে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
এরআগে বিকেল সাড়ে ৪টায় প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন। এসময় স্টেডিয়াম জুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছিল। বিকেল পৌনে ৪টায় জাতীয় সঙ্গীতের ইনস্ট্রুমেন্টাল সুর বাজানো হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রীসহ গ্যালারিতে উপস্থিত বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানান, নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রীড়া খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সরকার তা বাস্তবায়নে কাজ করছে। ইতোমধ্যে ক্রীড়া কার্ড ও ক্রীড়া ভাতার মতো সময়োপযোগী উদ্যোগ চালু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ হবে অদেখা প্রতিভা খুঁজে বের করার একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। এবারই প্রথম রাজধানীর বাইরে সিলেট থেকে এ ধরনের বড় আয়োজনের সূচনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই কর্মসূচির আওতায় ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোররা অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, দাবা, অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট- এই ৮টি খেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি ও ব্যাডমিন্টন হবে নকআউট পদ্ধতিতে। দাবা প্রতিযোগিতা হবে সুইস-লিগ পদ্ধতিতে। অন্যদিকে অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার ও মার্শাল আর্টে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর ফাইনাল রাউন্ড অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ১৩ থেকে ২২ মে’র মধ্যে আঞ্চলিক পর্যায়ের সব কার্যক্রম শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু হয়ে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বে জাতীয় পর্যায়ের সেরা খেলোয়াড়দের নির্বাচন করা হবে।
এর পরে বিকেল সাড়ে ৫ টায় সিলেট শিল্পকলা একাডেমিতে দলীয় নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময় করেন।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচির আওতায় সর্বশেষ বাসিয়া নদী খনন করা হয়েছিল। প্রায় ৪৭ বছর পর পুনরায় নদীটির খনন কাজ শুরু হলো।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য দেন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ অন্যান্য অতিথিরা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। ধাপে ধাপে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
আজকালের খবর/বিএস