মঙ্গলবার ১২ মে ২০২৬
বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ
প্রকাশ: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ১১:৫৪ পিএম   (ভিজিট : ৩৭)
আমাদের জীবনে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার নাম এখন নিত্যপণ্যের বাজার। সকালে যে পেঁয়াজ ৬০ টাকা, বিকেলে সেটিই ৯০ টাকা। এক সপ্তাহ আগে যে ডিম ডজনপ্রতি ১৩০ টাকা, পরের সপ্তাহে সেটি ১৬০ টাকয় উঠে যায়। চাল, তেল, ডাল, চিনি কিংবা সবজি—কোনো পণ্যের দামই যেন স্থির থাকে না। সবচেয়ে কষ্টকর বাস্তবতা হলো, মানুষ জানে না এই দাম বাড়ার প্রকৃত কারণ কী। আন্তর্জাতিক বাজার? আমদানি ব্যয়? নাকি অদৃশ্য কোনো সিন্ডিকেট?

বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থায় বহু বছর ধরে একটি শব্দ বারবার উচ্চারিত হয়ে আসছে—“সিন্ডিকেট”। এই সিন্ডিকেট কেবল কয়েকজন ব্যবসায়ীর গোপন সমঝোতা নয়; এটি এক ধরনের অদৃশ্য অর্থনৈতিক দখলদারিত্ব, যেখানে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে অস্বাভাবিক মুনাফা আদায় করা হয়। আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, যখন রাষ্ট্র দুর্বল থাকে কিংবা নজরদারি শিথিল হয়, তখন এই সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

এমন বাস্তবতায় সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের জন্য আশার খবর। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট ও কারসাজি ঠেকাতে সরকার পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে এআইভিত্তিক নজরদারির আওতায় আনার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী চিন্তা। কারণ আধুনিক বিশ্বে বাজার নিয়ন্ত্রণ কেবল অভিযান দিয়ে সম্ভব নয়; তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বুদ্ধিমান নজরদারি ছাড়া বাজার কারসাজি প্রতিরোধ করা প্রায় অসম্ভব।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বাজার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল তথ্যের অভাব এবং সমন্বয়ের সংকট। কোন পণ্য কোথায় কত মজুত আছে, কোন পর্যায়ে দাম বাড়ছে, কোথায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে—এসব বিষয়ে সরকারের হাতে নির্ভরযোগ্য ও তাৎক্ষণিক তথ্য থাকত না। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সহজেই সুযোগ নিত। তারা গুদামে পণ্য আটকে রাখত, সরবরাহ কমিয়ে বাজারে আতঙ্ক তৈরি করত, তারপর বাড়তি দামে বিক্রি করত। সাধারণ মানুষ তখন বাধ্য হয়ে বেশি দামে পণ্য কিনত, কারণ তার সামনে আর কোনো বিকল্প থাকত না।

এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু হলে এই চিত্র বদলাতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে যদি আমদানি, পাইকারি বাজার, গুদামজাতকরণ এবং খুচরা বিক্রির প্রতিটি স্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে কোথায় অস্বাভাবিক মজুত হচ্ছে কিংবা কোথায় দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। উন্নত বিশ্বে ইতোমধ্যেই এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো বাজার ব্যবস্থাপনায় ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছে। বাংলাদেশও যদি আন্তরিকভাবে এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে বাজার সিন্ডিকেটের শক্ত ভিত অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়বে।

তবে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, অনেক সময় বাজার কারসাজির সঙ্গে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্পর্ক থাকে। ফলে অভিযান শুরু হলেও তা মাঝপথে থেমে যায় কিংবা বড় খেলোয়াড়রা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে কোনো উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না। বাজারে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইনের চোখে সবাইকে সমান হতে হবে।

সরকার নির্বাচিত কিছু পণ্যের জন্য কৌশলগত মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা নিয়েছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে। তখন অসাধু ব্যবসায়ীরা সংকটকে পুঁজি করে দাম আরও বাড়িয়ে দেয়।

কিন্তু রাষ্ট্রের নিজস্ব পর্যাপ্ত মজুত থাকলে বাজারে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা সম্ভব হয়। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ কমে যায়।

বিশ্বের অনেক দেশই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৌশলগত মজুত গড়ে তুলেছে। ভারত খাদ্যশস্যের বিশাল রিজার্ভ বজায় রাখে। চীন দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য মজুতনীতির মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখে। এমনকি ইউরোপের অনেক দেশও জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও জ্বালানির মজুত রাখে। বাংলাদেশেও চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল ও পেঁয়াজের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণও সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা। গত বছর কুরবানির ঈদে প্রায় ১০ হাজার ৯০০ টন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হলেও এবার তা বাড়িয়ে প্রায় ১৪ হাজার টনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন। এটি শুধু সংখ্যার বৃদ্ধি নয়; এটি রাষ্ট্রের সামাজিক দায়িত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। কারণ বাজার যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হয় জনগণের পাশে দাঁড়ানো।

বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ভর্তুকিমূল্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহ এখন আর কেবল কল্যাণমূলক উদ্যোগ নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতারও পূর্বশর্ত। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। একজন দিনমজুর, রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক কিংবা নিম্ন আয়ের চাকরিজীবী যখন পরিবারের খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খান, তখন সমাজে হতাশা, ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উপকারভোগী তালিকা হালনাগাদ করা। আগের তালিকায় প্রায় ৫৯ লাখ ভুয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ নাম পাওয়া যাওয়ার তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রমাণ নয়; এটি দরিদ্র মানুষের অধিকার নিয়ে ভয়ংকর অনিয়মেরও ইঙ্গিত দেয়। প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত মানুষ বাদ পড়ে গেছে, অথচ অসাধু উপায়ে অনেকে সুবিধা নিয়েছে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নতুন ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে ৮০ লাখ মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং আরও ২০ লাখ মানুষকে এই সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা অবশ্যই প্রশংসনীয়।

তবে এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি কিংবা দুর্নীতির সুযোগ যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থায় আরেকটি বড় সমস্যা হলো মধ্যস্বত্বভোগীর আধিপত্য। কৃষক মাঠে যে দামে পণ্য বিক্রি করেন, ভোক্তা শহরে এসে তার কয়েকগুণ বেশি দামে সেই পণ্য কিনতে বাধ্য হন। এই বিশাল ব্যবধানের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের হাতে। ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, আবার ভোক্তাও স্বস্তি পান না। লাভবান হয় কেবল একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী।

এই চক্র ভাঙতে হলে কৃষিপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ, আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ, ডিজিটাল পাইকারি বাজার এবং কৃষক-ভোক্তা সংযোগ জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে বাজার মনিটরিং কমিটিকে কার্যকর করতে হবে। কেবল ঢাকা থেকে নির্দেশনা দিলেই হবে না; জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি। বাজারে অভিযান চালিয়ে কয়েক হাজার টাকা জরিমানা করলেই সিন্ডিকেট ভাঙবে না। প্রয়োজন বড় কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। যারা কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে মুনাফা করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সামাজিকভাবেও আমাদের সচেতন হতে হবে। অনেক সময় গুজব বা আতঙ্ক বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। “পেঁয়াজের সংকট হবে”, “চালের দাম আরও বাড়বে”—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনতে শুরু করে। এতে বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হয় এবং সিন্ডিকেট আরও লাভবান হয়। তাই তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারকে নিয়মিতভাবে বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে হবে।

বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে। উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং প্রবৃদ্ধির গল্প তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূল্যে নিত্যপণ্য কিনতে পারবে। কারণ অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য মেগা প্রকল্পে নয়, মানুষের রান্নাঘরের হাঁড়িতে প্রতিফলিত হয়।

বাজার সিন্ডিকেট কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি সামাজিক অন্যায়ও বটে। এটি মানুষের কষ্টকে পুঁজি করে মুনাফা অর্জনের নির্মম সংস্কৃতি। তাই এই সিন্ডিকেট ভাঙার লড়াই কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন, ব্যবসায়ী সমাজ এবং নাগরিকদের সম্মিলিত দায়িত্ব।

পরিশেষে বলা যায়,সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো যদি আন্তরিকতা,স্বচ্ছতা এবং কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। মানুষ অন্তত এই বিশ্বাস ফিরে পাবে যে রাষ্ট্র তাদের পাশে আছে, তাদের কষ্ট বোঝে, এবং বাজারকে কিছু গোষ্ঠীর জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করতে সত্যিই কাজ করছে। 

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সরকার তথা রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—তার নাগরিক যেন সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে, ন্যায্যমূল্যে খাবার কিনতে পারে, এবং প্রতিদিনের বাজার করতে গিয়ে অসহায় বোধ না করে। সুতরাং যে কোনো মূল্যে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতেই হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।


আজকালের খবর/ এমকে









Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft