বুধবার ১৩ মে ২০২৬
হামের ছায়ায় ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি: সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ৫:৩৯ পিএম   (ভিজিট : ৩২)
রাজধানীসহ সারা দেশে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতের পর এডিস মশার উপদ্রব উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। হামের প্রাদুর্ভাবে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যখন ইতোমধ্যে চরম চাপের মুখে, ঠিক সেই সময়ে ডেঙ্গু এক নতুন ও ভয়ংকর হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, ডেঙ্গুতে সারাদেশে মোট মৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি ঘটেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের এলাকায়। এই যুগপৎ সংকট মোকাবিলায় শুধু সাধারণ সতর্কতা নয়, বরং বৈজ্ঞানিক, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
ডেঙ্গু ভাইরাসের উৎপত্তি আফ্রিকা ও এশিয়ার গভীর বনাঞ্চলে। 

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটি প্রথমে বানরসহ প্রাইমেটদের মধ্যে সিলভ্যাটিক চক্রের মাধ্যমে ছড়িয়েছে। প্রাচীন চীনের জিন রাজবংশের চিকিৎসা গ্রন্থে ‘জলবিষ’ নামে যে রোগের বর্ণনা পাওয়া যায়, তা সম্ভবত ডেঙ্গুরই প্রথম উল্লেখ। ষোড়শ শতাব্দীতে ক্যারিবিয়ান ও মধ্য আমেরিকায় এর মহামারি দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, দাস বাণিজ্য এবং ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণের ফলে এডিস মশা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে এই রোগ শহুরে মহামারিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশে ১৯৬০-এর দশক থেকে ডেঙ্গু নিয়মিত সমস্যা হয়ে উঠেছে। ২০০০ সালের পর থেকে এর প্রকোপ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মশার কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে রোগটি এখন আর শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।

বর্তমানে বৃষ্টির পানি জমে থাকা বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার বংশবিস্তার দ্রুত ঘটছে। রাজধানীর গুলশান, কড়াইল বস্তি, বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবন, ছাদের ড্রেন, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল, পুরনো টায়ার, ফুলের টব এবং জলাবদ্ধ এলাকায় পানি জমে মশার আদর্শ প্রজননক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। গুলশান লেকের জঞ্জালপূর্ণ বদ্ধ পানি এখন মশার বড় আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম মিয়ার মতো অনেকেই জানিয়েছেন, দিনের বেলাতেও কয়েল জ্বালিয়ে বসতে হয়। বিশেষজ্ঞরা লক্ষ করেছেন, আগে স্বচ্ছ পানিতে এডিসের বংশবৃদ্ধি ঘটত, কিন্তু এখন ঢাকার নোংরা পানিতেও এই মশা সহজেই অভিযোজিত হয়ে উঠেছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। শিশু, বয়স্ক এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষেরা এই রোগের ঝুঁকিতে বেশি রয়েছেন।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অত্যধিক জনঘনত্ব, জলাবদ্ধতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ডেঙ্গুর বিস্তারকে উস্কে দিচ্ছে। নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেছেন, শুধু ফগিং করে কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, জৈবিক ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আমূল সংস্কার জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাতের ধরন অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠেছে, যা জলাবদ্ধতা বাড়াচ্ছে এবং মশার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন লার্ভিসাইডিং, ফগিং, খাল-ড্রেন পরিষ্কার এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডে বিশেষ অভিযান জোরদার করেছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৭৫ ওয়ার্ডে প্রাক-বর্ষা এডিস লার্ভা জরিপ শুরু করেছে। মোবাইল কোর্ট, ক্র্যাশ প্রোগ্রাম এবং ‘ক্লিনিং ডে’র মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিটি হাসপাতালে ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ, স্যালাইন ও ওষুধের মজুদ এবং কুইক রেসপন্স টিম মোতায়েন করেছে। তবে এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দৃঢ়তা, আন্তঃদপ্তর সমন্বয় এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর।

গত পাঁচ বছরের তথ্য মৃত্যুর উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। ২০২১ সালে ১০৫ জন, ২০২২ সালে ২৮১ জন, ২০২৩ সালে রেকর্ড ১৭০৫ জন, ২০২৪ সালে ৫৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানী প্রতি বছর মৃত্যুর সিংহভাগ বহন করছে। এডিস মশা এখন গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ায় ঝুঁকি জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে উলবাখিয়া ব্যাকটেরিয়া এক বিপ্লবী সমাধান। এটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া, যা এডিস মশায় সংযোজিত করে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি বাধা দেয় এবং মশার জনসংখ্যা কমায়।

বিশ্বে সাফল্যের দৃষ্টান্ত অত্যন্ত উৎসাহজনক। ইন্দোনেশিয়ার ইয়োগিয়াকার্তায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও New England Journal of Medicine-এ প্রকাশিত র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়ালে দেখা গেছে, উলবাখিয়া-সংক্রমিত মশা ছাড়ার পর ডেঙ্গু সংক্রমণ ৭৭ শতাংশ কমেছে এবং হাসপাতালে ভর্তির হার ৮৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এটি সব চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ব্রাজিলের নিতেরয় শহরে ৬৯ শতাংশ, অন্যান্য এলাকায় ৭৫ শতাংশ এবং জয়ভিলে শহরে প্রাথমিক ফলাফলে ৯০ শতাংশ ডেঙ্গু কমেছে। সিঙ্গাপুরে পুরুষ মশা ছাড়ার পদ্ধতিতে মশার জনসংখ্যা ও ডেঙ্গু ঝুঁকি ৭১-৭২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার টাউন্সভিলে দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গু প্রায় নির্মূল হয়েছে। বিশ্ব মসকুইটো প্রোগ্রাম (WMP) অনুসারে, ১৪টি দেশে এই পদ্ধতি প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষকে সুরক্ষা দিয়েছে এবং লাখ লাখ কেস প্রতিরোধ করেছে।

বাংলাদেশে সম্ভাবনা উজ্জ্বল। ২০২৫ সালের মে মাসে আইসিডিডিআর,বি ও আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল ঢাকার স্থানীয় এডিস মশায় উলবাখিয়া সফলভাবে সংযোজন করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এতে ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ানোর হার ৯২.৭ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, পাইলট প্রকল্প হিসেবে এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন বিবেচনাধীন। এখন সময় এসেছে এটিকে দ্রুত বৃহত্তর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার।

সরকারের করণীয়: উলবাখিয়া পদ্ধতির বড় আকারের পাইলট প্রকল্প শুরু করা, আইসিডিডিআর,বি ও বিশ্ব মসকুইটো প্রোগ্রামের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো, কীটনাশকের পাশাপাশি জৈবিক পদ্ধতিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, সবুজায়ন এবং নগর পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা। হাম ও ডেঙ্গুর যৌথ মোকাবিলায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার করতে হবে।

নাগরিকদের করণীয়: প্রতিটি বাসা-বাড়ির আশপাশে তিন দিনের বেশি পানি জমতে না দেওয়া, ফুলের টব, টায়ার ও বোতল ঢেকে রাখা, জ্বর হলেই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া, সচেতনতা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এবং স্থানীয় সরকারের অভিযানে সহযোগিতা করা। ‘নিজ বাড়ি নিজে পরিষ্কার’ অঙ্গীকার প্রতিটি নাগরিককে পালন করতে হবে।

হাম ও ডেঙ্গুর যুগপৎ হুমকি আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। উলবাখিয়ার মতো আধুনিক প্রযুক্তি, সরকারের দৃঢ় উদ্যোগ এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা এই সংকটকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারব। সময় এখনই। দেরি করলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়বে। স্বাস্থ্যসচেতন, পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব নগরায়ণের মাধ্যমে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করতে হবে। এটি শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, প্রতিটি নাগরিকেরও।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।


আজকালের খবর/বিএস 









Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft