প্রকৃতি কখনো একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে না। আমাদের চার পাশে থাকা পাহাড়, নদী, বন, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, উদ্ভিদ সবকিছু মিলেই গড়ে ওঠে পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য। এই ভারসাম্যের অন্যতম ভিত্তি হলো জীববৈচিত্র্য। প্রতিটি প্রাণী, প্রতিটি উদ্ভিদ এবং অণুজীবও প্রকৃতির এই বৃহৎ চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটির অনুপস্থিতি অন্যটির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে। তাই জীববৈচিত্র্য কেবল প্রকৃতির অলংকার নয়; এটি মানবসভ্যতার টিকে থাকার প্রধান শর্ত।
প্রকৃতির নিজস্ব ভারসাম্যই সমগ্র পৃথিবীকে সুরক্ষা দিচ্ছে। আর প্রকৃতির এই ভারসাম্য রক্ষা করছে জীব-বৈচিত্র্য। প্রতিটি জীব পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল এবং আমাদের অস্তিত্বকে রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু উদাসীনতা ও ভোগবাদী আচরণের কারণে প্রতিনিয়ত এই জীব-বৈচিত্র্যকে মানুষ ধ্বংস করছে। তাই জীবজগতের ভারসাম্য বজায় রাখা ও পরিবেশের সুরক্ষার স্বার্থে সব জীবকেই বাঁচার সুযোগ দিতে হবে। প্রকৃতি কেবল অলংকার এবং সৌন্দর্য নয়; মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, খাদ্য, অর্থনীতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের মূল ভিত্তি।
বিশেষত: মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং নিরাপদ পরিবেশ সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। মৌমাছি ও প্রজাপতির মতো পরাগবাহী প্রাণী না থাকলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বনভূমি না থাকলে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক চক্র ভেঙে পড়বে। নদী ও জলাশয়ের প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হলে মাছের উৎপাদন কমে যাবে এবং খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। তাই প্রওকৃতি শুধু অলংকারই নয় একই সঙ্গে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান মানুষের জীবনযাত্রাকে নীরবে সহায়তা করে যাচ্ছে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক ভোগবাদী জীবনযাপন এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে প্রতিনিয়ত জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। বন উজাড়, পাহাড় কাটা, নদী দখল, জলদূষণ এবং অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। নগরায়ণের নামে কংক্রিটের বিস্তার বাড়ছে, অথচ কমে যাচ্ছে সবুজের পরিমাণ। মানুষের এই উদাসীন আচরণ প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্যকে নষ্ট করছে। বাংলাদেশের বাস্তবতাও উদ্বেগজনক। একসময় গ্রামবাংলায় যেসব পাখির কলকাকলিতে সকাল শুরু হতো, আজ তাদের অনেকেই হারিয়ে গেছে। জলাভূমি ভরাট হওয়ায় দেশীয় মাছের প্রজাতি কমে যাচ্ছে। সুন্দরবনের মতো বিশ্ব ঐতিহ্যও জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট নানা সংকটের কারণে ঝুঁকির মুখে। অথচ এই বন শুধু প্রাণিকুলের আশ্রয়স্থল নয়, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবেও কাজ করে।
জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে জলবায়ুর ওপর। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও বন্যার মতো দুর্যোগ ক্রমেই বাড়ছে। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে মানুষও নিরাপদ থাকতে পারে না সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বাস্তবতা সেটিই প্রমাণ করছে। করোনা মহামারির সময়ও বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছিলেন, বন্যপ্রাণীর আবাস ধ্বংস এবং পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ নতুন নতুন রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ অবস্থায় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। শুধু সরকারের একক উদ্যোগে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধ। বন ও জলাভূমি সংরক্ষণ, অবৈধ বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধ, পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা চালু এবং শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ব্যক্তিগত পর্যায়েও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গাছ লাগানো, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ এবং প্রাণিকুলের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ এসব ছোট ছোট উদ্যোগও প্রকৃতি রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি ধ্বংস করে মানুষ কখনো উন্নত হতে পারে না। কারণ মানুষ নিজেও প্রকৃতিরই অংশ। প্রকৃতি কেবল সৌন্দর্যের আধার নয়; এটি মানবজীবনের অস্তিত্বের ভিত্তি। জীববৈচিত্র্য রক্ষা মানে নিজের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। তাই উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস না করে, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের পথ বেছে নিতে হবে। আজকের সচেতন সিদ্ধান্তই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে পারে।
উল্লেখ্য, ২১ মে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে আলোচকদের বক্তব্যে এ নিয়ে উদ্ধেগ প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়,‘স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যে’র সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। প্রকৃতিতে বিরাজমান জীব-বৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করলে মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবো। বর্তমানে অপরিকল্পিত নগরায়ন, নদী-খাল দখল ও দূষণ, অতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার, বন উজাড়, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উন্মুক্ত মাঠ-পার্ক কমে যাওয়ার কারণে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ছোট ছোট সচেতন উদ্যোগ বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
শহরে গাছপালা কমে যাওয়ায় জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস, মাটির ক্ষয়, বন্যা এবং বৃষ্টিপাতের তারতম্য, তাপদাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে যা সামগ্রিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিকে ত্বরান্বিত করে এবং ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে। এসিতে ব্যবহৃত রেফ্রিজারেন্ট যেমন-সিএফসি এবং এইচএফসি গ্যাস বায়ুম-লে নির্গত হয়ে ওজোন স্তরের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ হয়। নদী ও জলাশয় দূষিত হওয়ার ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হচ্ছে এবং জলজ প্রাণী, শৈবাল, প্রবালসহ সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। ওষধি গাছ সংরক্ষণ করার উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি কারণ এটি বনের বাস্তুতন্ত্র এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে।
প্রকৃতি তার আপন গতিতে চলে। মানুষ যখন সেই গতিপথে বাধা দেয়, তখনই প্রকৃতি রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। সাম্প্রতিক সময়ের মহামারি, ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের বারবার সতর্ক সংকেত দিচ্ছে। আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, তবে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো মানুষের বসবাসের উপযোগী কোনো পৃথিবী অবশিষ্ট থাকবে না। নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে হবে, প্রকৃতির সঙ্গে সন্ধি করতে হবে। পৃথিবীর সবুজ রূপ ফিরিয়ে আনাই হোক আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার। কারণ প্রকৃতি বাঁচলে তবেই বাঁচবে মানবজাতি। পৃথিবী নামক এই গ্রহটি আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া কোনো উত্তরাধিকার নয়, বরং এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে নেওয়া এক ঋণ। সেই ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হলো একটি বাসযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তাদের জন্য রেখে যাওয়া। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, সহাবস্থানই হোক আমাদের বেঁচে থাকার মন্ত্র।
এসব কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্কুল-কলেজ ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রচারণা জরুরি। পরিবেশ ও জীব- বৈচিত্র্য সুরক্ষায় তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই মহৎ কর্মযজ্ঞে তাদের সম্পৃক্ত করা দরকার। এ ক্ষেত্রে তামাক স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তামাক চাষ আবাদ যোগ্য ভূমির উর্বরতা নষ্ট করছে। অথচ তামাক কোম্পানি জনস্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করে ব্যবসায়িক মুনাফা লাভের আশায় তামাক চাষ করছে এই প্রবণতা থেকে তাদের বের করে আনতে হবে। তাছাড়া প্রতিটি শহরে নির্দিষ্ট পরিমাণ উন্মুক্ত মাঠ ও পার্ক সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণ, নদী-খাল ও জলাভূমি দখলমুক্ত রাখতে হবে।
এবং নগর পরিকল্পনায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার প্রদান, নতুন ভবন নির্মাণে সবুজায়ন নিশ্চিতকরণ, স্থানীয় খাবার ও দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি ও সহজলভ্য করা, দেশীয় গাছ ও কৃষিপণ্য সংরক্ষণে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি সহায়তা বাড়ানো, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ে পাঠদান, ছাদকৃষি ও নগর কৃষিতে কর প্রণোদনা দেয়া, হাঁটা, সাইকেল ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহী করা, নগরের অভ্যন্তরে উন্মুক্ত স্থান, পার্ক ও খেলার মাঠ বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ করা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার, নাগরিক সমাজ ও তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর মাধ্যমেই সম্ভব প্রাণ প্রকৃতির যথাযথ সংরক্ষণ। এসব করা দরকার এ কারণেই জীববৈচিত্র টিকে থাকলে মানুষ টিকে থাকবে মানব সভ্যতা সমহিমায়, আনন্দের সঙ্গে সুস্থ্য ভাবে।
লেখক: সম্পাদক-ক্লাইমেট জার্নাল২৪.কম, সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম।
আজকালের খবর/ এমকে