বৃহস্পতিবার ১৪ মে ২০২৬
বিশ্ব অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের এভিয়েশন টেকনিক্যাল শিক্ষা সময়ের দাবি
প্রকাশ: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ৫:০৮ পিএম  আপডেট: ১৩.০৫.২০২৬ ৫:১৫ পিএম  (ভিজিট : ৩৯)
বাংলাদেশ বর্তমানে একদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত বেকারত্বের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। দেশে প্রতিবছর লক্ষাধিক তরুণ-তরুণী উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিপ্লোমা শিক্ষা সম্পন্ন করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে প্রায় ২০ থেকে ২৩ লক্ষ শিক্ষিত বেকার যুবক রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিনির্ভর, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও উচ্চ দক্ষতাভিত্তিক খাত হিসেবে “এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ারিং” বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় নতুন দিগন্ত হতে পারে।

বিশ্বব্যাপী এভিয়েশন শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে আগামী কয়েক বছরে বিশ্বে দক্ষ বিমান প্রকৌশলী, এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিক্যাল জনবলের ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হবে। অথচ বাংলাদেশে এখনও এ খাতের উন্নয়নে পর্যাপ্ত সরকারি পরিকল্পনা, নীতি সহায়তা ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশে বর্তমানে সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠান CAAB Part-147 অনুমোদিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর তুলনায় এ সুযোগ অত্যন্ত অপ্রতুল। অধিকাংশ শিক্ষার্থী SSC বা HSC পাসের পর সঠিক দিকনির্দেশনা, স্কলারশিপ ও প্রশিক্ষণ সুবিধার অভাবে বিদেশমুখী অথবা বেকারত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ Aircraft Maintenance, Repair & Overhaul (MRO) শিল্প গড়ে উঠলে বছরে শত শত মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন এয়ারলাইন্সকে ভারী রক্ষণাবেক্ষণ কাজ বিদেশে করাতে হয়, যার ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। একইসঙ্গে বিদেশি প্রকৌশলী ও টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের উপর নির্ভরতা বেড়ে যাচ্ছে। অথচ দেশীয় দক্ষ জনবল তৈরি করা গেলে এই নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশ বিমানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং বিমান বাহিনীর কিছু প্রশিক্ষণ কার্যক্রম থাকলেও দেশের চাহিদার তুলনায় তা অত্যন্ত সীমিত। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানের EASA ও CAAB লাইসেন্সিং প্রশিক্ষণ, আধুনিক ল্যাব, সিমুলেটর, হ্যাঙ্গারভিত্তিক হাতে-কলমে শিক্ষা এবং ইন্ডাস্ট্রি-লিংকড স্কিল ডেভেলপমেন্ট এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি “সুপার স্কিলস টেকনিক্যাল হ্যান্ডস” উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। এ লক্ষ্যে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, CAAB, বাংলাদেশ বিমান এবং বেসরকারি এভিয়েশন ইনস্টিটিউটসমূহের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত দাবিগুলো জোরালোভাবে উত্থাপন করা হয়েছে-

প্রথমত, দেশের বিভাগীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন Aviation Technical Training & Skill Development Institute স্থাপন করতে হবে, যেখানে CAAB Part-147 এবং ভবিষ্যতে EASA মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।

দ্বিতীয়ত, SSC পাসের পর মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি স্কলারশিপ ও সহজ শিক্ষাঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে দরিদ্র কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীরা এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় অংশ নিতে পারে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বিমান বাহিনী এবং বেসরকারি এয়ারলাইন্সসমূহের সঙ্গে যৌথভাবে “Industry Integrated Internship & OJT Program” চালু করা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ লাভ করতে পারে।
চতুর্থত, বিদেশি প্রকৌশলীদের উপর নির্ভরতা কমাতে সরকারি ও বেসরকারি খাতে “Bangladeshi Licensed Aircraft Engineer Development Program” চালু করতে হবে।

পঞ্চমত, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক MRO Hub প্রতিষ্ঠা করা গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম এভিয়েশন সার্ভিস সেন্টারে পরিণত হতে পারে। এতে হাজার হাজার উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন পথ খুলবে।

ষষ্ঠত, কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সমমানের মর্যাদা দিয়ে Aviation & Aerospace Engineering শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্যারিয়ার ট্র্যাক তৈরি করা জরুরি।

বর্তমান বিশ্বে শুধু ডিগ্রি নয়, দক্ষতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। বাংলাদেশ যদি আগামী ২০৪১ সালের উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে এখনই এভিয়েশন, এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স এবং অ্যারোস্পেস টেকনিক্যাল শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার খাতে পরিণত করতে হবে।

একটি দক্ষ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও প্রযুক্তিনির্ভর তরুণ প্রজন্মই পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে। এখন প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, আন্তরিক উদ্যোগ এবং বাস্তবভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ।

লেখক: এডুকেশনাল এনালিস্ট, ঢাকা, বাংলাদেশ।










Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft