বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তার ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। স্বাধীনতা-পরবর্তী খাদ্য সংকট, দুর্ভিক্ষ ও কৃষি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার সময়ে তিনি কৃষিকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেন। ৩০ মে তাঁর ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে এই রাষ্ট্রনায়ককে।
১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের কৃষি খাতে যে নীতিগত ও অবকাঠামোগত পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, তার প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশক ধরে দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার ভিত্তি অনেকাংশে গড়ে ওঠে সত্তরের দশকের শেষভাগে গৃহীত বিভিন্ন কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে।
কৃষিকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনা
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি গ্রাম ও কৃষি। তাই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনকে তিনি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেন। কৃষিকে শুধু উৎপাদন খাত নয়, বরং কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাঁর সময়ে।
খাল খনন কর্মসূচি: কৃষি পুনর্জাগরণের উদ্যোগ
১৯৭৭ সালে দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় হাজার হাজার মাইল খাল খনন ও পুনঃখননের মাধ্যমে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষি উৎপাদন সম্প্রসারণে সহায়তা করা হয়। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়।
সেচ সম্প্রসারণ ও বোরো চাষের বিস্তার
রাষ্ট্রপতি জিয়ার আমলে গভীর নলকূপ, অগভীর নলকূপ এবং লো-লিফট পাম্প ব্যবহারের মাধ্যমে সেচব্যবস্থা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। এর ফলে এক ফসলি জমি দুই ও তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। বিশেষ করে বোরো ধান চাষের সম্প্রসারণ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭০-৭১ অর্থবছরে বোরো ধানের আবাদ ছিল প্রায় ৯.৮২ লাখ হেক্টর এবং উৎপাদন ছিল ২১.৯ লাখ মেট্রিক টন। ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে বোরো আবাদ বেড়ে দাঁড়ায় ১১.৬১ লাখ হেক্টরে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে হয় প্রায় ২৬.৩ লাখ মেট্রিক টন। উচ্চফলনশীল (HYV) বোরো ধানের আবাদও এ সময়ে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পায়।
নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন
এই সময়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর গবেষণা কার্যক্রম আরও জোরদার হয়। BR4, BR5, BR6, BR7, BR8, BR9, BR10 ও BR11-নামে উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করা হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) থেকেও উন্নত ধানের জাত উদ্ভাবিত হয়। এসব জাত কৃষকদের অধিক ফলন পেতে সহায়তা করে এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত করে।
সার, কৃষিঋণ ও প্রযুক্তির প্রসার
কৃষকদের কাছে রাসায়নিক সার সহজলভ্য করা, কৃষিঋণ সম্প্রসারণ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়। ফলে কৃষি উৎপাদন ধীরে ধীরে প্রযুক্তিনির্ভর ও বাণিজ্যিক চরিত্র লাভ করতে শুরু করে।
Food for Work: উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সমন্বয়
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে “Food for Work” কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ রাস্তা, বাঁধ ও খাল নির্মাণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। এ কর্মসূচি গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
কৃষিভিত্তিক আত্মনির্ভরতার দর্শন
উৎপাদন বৃদ্ধিকে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করতেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর কৃষিনীতি ছিল উৎপাদনমুখী, কৃষকবান্ধব, গ্রামকেন্দ্রিক এবং আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্যে পরিচালিত।
বাংলাদেশের কৃষিতে আধুনিক সেচব্যবস্থা, বোরো ধানের সম্প্রসারণ, খাল পুনঃখনন এবং উচ্চফলনশীল জাতের বিস্তারে তাঁর সময়ের বিভিন্ন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কৃষি উন্নয়নের ইতিহাসে এসব কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তার ইতিহাসে তাঁর অবদান গবেষক, কৃষিবিদ ও সাধারণ মানুষের কাছে যুগ যুগ ধরে আলোচিত হবে।
লেখক: সাবেক স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক দিনকাল
আজকালের খবর/ এমকে