রবিবার ২৪ মে ২০২৬
অসাধু কসাইদের প্রতারণা ও আমাদের অজ্ঞতা: সতেজতার আড়ালে অনিরাপদ মাংস
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ১:৩৪ পিএম   (ভিজিট : ২২)
আমাদের দেশের বাজারে গরু বা ছাগলের মাংস কেনার সময় অনেকেই একটি বিষয় লক্ষ্য করেন, কিছু মাংস অস্বাভাবিক রকম টকটকে লাল, অতিরিক্ত ভেজা ও পিচ্ছিল দেখায়। বেশিরভাগ ক্রেতা এটাকেই “সতেজ বা টাটকা” মাংস ভেবে কিনে নেন। অথচ বাস্তবে এই অতিরিক্ত লালচে ভাব কিন্তু ভালো মানের মাংসের লক্ষণ নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি হতে পারে অসাধু ব্যবসায়িক কৌশলের ফল।

বহু মানুষ অভিযোগ করেন, বাজারের গরুর মাংস খেলে শরীরে চুলকানি বা অ্যালার্জির সমস্যা হয়, কিন্তু কোরবানির সময় গরুর মাংস খেলে এই সমস্যা তুলনামূলক কম দেখা যায়। যদিও এর পেছনে ব্যক্তিভেদে নানা কারণ থাকতে পারে, তবুও জবাই-পরবর্তী রক্ত নিষ্কাশন, সংরক্ষণ পদ্ধতি, পরিচ্ছন্নতা এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একটি সুস্থ স্বাভাবিক পশুর শরীরে মোট ওজনের প্রায় ৭-৮ শতাংশ পর্যন্ত রক্ত থাকে। অর্থাৎ ৪০০ কেজি ওজনের একটি গরুর শরীরে আনুমানিক ৩০-৩২ লিটার রক্ত থাকতে পারে। নিরাপদ খাদ্য নীতি, আধুনিক খাদ্যবিজ্ঞান এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ সব ক্ষেত্রেই জবাইয়ের পর পশুর শরীর থেকে যতটা সম্ভব রক্ত বের করে দেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়।

সঠিক পদ্ধতিতে জবাই করলে হৃদপিণ্ড কিছু সময় সক্রিয় থাকে এবং রক্তনালীর চাপের কারণে শরীরের রক্তের বড় অংশ বের হয়ে আসে। এতে মাংস তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। কিন্তু কিছু অসাধু কসাই দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করতে ও ওজন বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে জবাইয়ের পরপরই পশুর মেরুদণ্ড বা স্পাইনাল কর্ডে ধাতব বস্তু বা ছুরি ঢুকিয়ে দেয়। এতে স্নায়ুবিক কার্যক্রম দ্রুত বন্ধ হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক রক্তক্ষরণ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে শরীরের ভেতরে তুলনামূলক বেশি রক্ত থেকে যায়। এই রক্ত মাংসকে অতিরিক্ত লাল, চকচকে, পিচ্ছিল ও ভারী দেখায়, যা সাধারণ ক্রেতার কাছে “তাজা” বলে মনে হয়। বাস্তবে ভোক্তা বুঝতেই পারছেন না, তিনি শুধু মাংস নয়, অতিরিক্ত পানি ও রক্তের ওজনও কিনছেন।

আর রক্ত অত্যন্ত পুষ্টিকর মাধ্যম হওয়ায় সেখানে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে যদি মাংস দীর্ঘক্ষণ খোলা পরিবেশে রাখা হয় বা যথাযথ কোল্ড চেইন (cold chain) বজায় না থাকে। বাজারের অনেক দোকানে দেখা যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাংস ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যেখানে ধুলাবালি, মাছি, গরম আবহাওয়া ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সরাসরি প্রভাব থাকে। ফলে সেখানে জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতিতে কিছু ব্যাকটেরিয়া মাংসে থাকা হিস্টিডিন (Histidine) নামক অ্যামিনো অ্যাসিডকে ভেঙে বায়োজেনিক অ্যামিন (biogenic amines) তৈরি করে, যার মধ্যে হিস্টামিন অন্যতম। 

যা হিস্টামিন সংবেদনশীল ব্যক্তিদের শরীরে চুলকানি, ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি, মাথাব্যথা কিংবা হজমের সমস্যার মতো উপসর্গ তৈরি করে। 

এছাড়া পশুর রক্তে ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন বিপাকীয় বর্জ্য পদার্থ থাকে। তাই অনিরাপদ পরিবেশে সংরক্ষিত বা দীর্ঘ সময় উন্মুক্ত রাখা অতিরিক্ত রক্তযুক্ত মাংস গ্রহণ জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এ ধরনের মাংস তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।  

কোরবানির সময় সাধারণত পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে পশু জবাইয়ের পর পর্যাপ্ত সময় ধরে রক্ত ঝরতে দেওয়া হয়। পরে মাংস দ্রুত ভাগ করে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক রান্না করা হয়। ফলে দীর্ঘ সময় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খোলা অবস্থায় বাজারে ঝুলিয়ে রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় না। এ কারণেও অনেকের কাছে কোরবানির মাংস কম সমস্যাজনক মনে হতে পারে।  

এই সমস্যার সমাধানে নিরাপদ উপায়ে প্রাণী জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিকভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অনুসরণ করতে হবে। প্রথমত, জবাইয়ের আগে নির্দিষ্ট সময় (১২ - ২৪ ঘণ্টা) পর্যন্ত প্রাণীকে খাদ্য থেকে বিরত রাখতে হবে, শুধু পানি চলবে। এতে Fecal Contamination এর ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং মাংস তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন থাকে। 

দ্বিতীয়ত, জবাই ও প্রক্রিয়াকরণের সময় প্রাণীকে অতিরিক্ত চাপমুক্ত রাখা জরুরি, কারণ স্ট্রেস মাংসের pH পরিবর্তন করে গুণগত মান নষ্ট করতে পারে; একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে ও নির্ধারিত পদ্ধতিতে জবাই ও রক্ত নিষ্কাশন, জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার, যথাযথ হাইজিন বজার রাখা এবং ক্রস-কন্টামিনেশন এড়িয়ে চলা মাংসের নিরাপদতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  

তৃতীয়ত, জবাইয়ের পর মাংস দীর্ঘ সময় খোলা পরিবেশে না রেখে দ্রুত শীতলীকরণ (chilling) করতে হবে (২-৪ ঘন্টা) ও সঠিক কোল্ড চেইন বজায় রাখাতে হবে কারণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে মাংস দূষিত করতে পারে। 

এভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে মাংসের নিরাপদতা ও গুণগত মান বজায় থাকবে এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।  

লেখক:  নিরাপদ খাদ্য অফিসার, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ 
  
আজকালের খবর/ এমকে









Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft