জীবনের ঝুঁকি যেন নিত্যসঙ্গী। তবুও পরিবার-পরিজনের মুখে হাসি ফোটাতে প্রতি বছরই উপকূলের হাজারো মৌয়াল পা রাখেন সুন্দরবন-এর গভীর অরণ্যে। বাঘের ভয়, দস্যুর আতঙ্ক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে তারা সংগ্রহ করেন খাঁটি প্রাকৃতিক মধু।
বন বিভাগ চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে দুই মাসের জন্য মধু আহরণের অনুমতি দিয়েছে। পারমিট নিয়ে দলবদ্ধভাবে বনে প্রবেশ করছেন মৌয়ালরা। প্রতিটি দলে সাধারণত ৮ থেকে ১২ জন সদস্য থাকেন। ছোট নৌকায় নদী পাড়ি দিয়ে বনের গভীরে পৌঁছে তারা ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকেন। সঙ্গে থাকে খাদ্য, জ্বালানি, দা, দড়ি এবং ধোঁয়া তৈরির সরঞ্জাম।
মধু আহরণের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অভিজ্ঞ মৌয়ালরা প্রথমে গাছের উঁচু ডালে থাকা মৌচাক শনাক্ত করেন। শুকনো পাতা বা ঘাস জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে মৌমাছিকে শান্ত করা হয়। এরপর একজন মৌয়াল দড়ি বেয়ে গাছে উঠে চাক কেটে নিচে নামান, আর নিচে থাকা সদস্যরা তা সংগ্রহ করেন। একটি বড় মৌচাক থেকে কয়েক কেজি মধু পাওয়া যায়।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় ভয় রয়েল বেঙ্গল টাইগার-এর আক্রমণ। প্রায় প্রতি বছরই বাঘের হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া নদীতে কুমির, জঙ্গলে বিষধর সাপ, হঠাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বনদস্যুর উৎপাত তাদের জীবনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে।
বিপদের মুখে মৌয়ালরা ধর্মীয়ভাবে প্রস্তুতি নেন। অনেকেই বনবিবি-এর কাছে প্রার্থনা করেন, যেন বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পান।
শ্যামনগরের মৌয়াল আব্দুল করিম বলেন, “আমরা জানি বনে গেলে মৃত্যুর ঝুঁকি আছে, কিন্তু না গেলে সংসার চলে না।” হাবিবুর রহমান যোগ করেন, “এক মৌসুমের আয় দিয়েই সারা বছর চলতে হয়। অনেক সহকর্মীকে হারিয়েছি, তবুও জীবিকার তাগিদে আবার যেতে হয়।”
সুন্দরবনের মধু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয় এবং খাঁটি হওয়ায় এর চাহিদা বেশি। বিদেশেও এই মধু রপ্তানি হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উপকূলীয় অঞ্চলের বহু পরিবার এই পেশার ওপর নির্ভরশীল।
তবে মৌয়ালরা নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে বাঘের আক্রমণ প্রতিরোধ, বনদস্যু দমন এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তারা।
ঝুঁকি, ভয় ও অনিশ্চয়তার মাঝেই চলছে মৌয়ালদের জীবন সংগ্রাম। প্রতিটি দিন তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। তবুও থেমে নেই জীবন—বাঘ ও দস্যুর আতঙ্ক উপেক্ষা করেই এগিয়ে চলছে সুন্দরবনের মধু সংগ্রহ কার্যক্রম।
আজকালের খবর/ এমকে