মঙ্গলবার ২১ এপ্রিল ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট এবার ‘এসআইআর’ আর ‘সরকারবিরোধী’ শিবিরের লড়াই
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৫৪ এএম   (ভিজিট : ১৩৩)
বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রচার-প্রচারণায় এখন সরগরম বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ।

টানা ১৫ বছর ধরে রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস চাইছে এবারও নির্বাচনে জিতে ক্ষমতা ধরে রাখতে। অন্যদিকে তাদের শক্ত প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে এক যুগ ধরে কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা বিজেপি। নরেন্দ্র মোদীর দলটি ‘প্রাণান্ত’ চেষ্টা চালাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ নিজেদের কব্জায় আনতে।

ভোটের মাঠের হালচাল দেখে বিশ্লেষকরা বলছেন, মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি এবার বিধানসভা নির্বাচনে উভয় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইও হবে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতে, এবার নির্বাচনে মূলত লড়াই হবে বিজেপি সরকারের ভোটার তালিকা হালনাগাদের উদ্যোগ স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা- এসআইআর) এর বিরোধী এবং ‘সরকারবিরোধী’ শিবিরের মধ্যে।

পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪ আসনের এই বিধানসভায় ভোট হবে দুই দিনে- ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। এতে কে জয়ী হচ্ছে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ৪ মে পর্যন্ত। সরকার গঠনের জন্য যেকোনো দলের অন্তত ১৪৮ আসনে জিততেই হবে।

সোমবার টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চতুর্থবারের মতো নিজের ‘দুর্গ’ পশ্চিমবঙ্গ রক্ষা করে তার সরকারের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়িয়ে ২০ বছরে নিয়ে যেতে চাওয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য কাজটি সহজ হওয়ার কথা না। কারণ তার সামনে আছে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি, যাদের আছে ‘অফুরন্ত সম্পদ’ এবং ‘তারকা প্রচারক’ নরেন্দ্র মোদী।

ভোটের আগে স্বাভাবিকভাবেই ২০২১ সাল থেকে রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা মমতার সরকারকে গত ১৫ বছরের কর্মকাণ্ড এবং নানা ইস্যুতে ব্যর্থতার জন্য ‘কাঠগড়ায়’ দাঁড়াতে হত। এ ক্ষেত্রে ‘সরকারবিরোধী হাওয়াই’ হত প্রধান ইস্যু।

কিন্তু পরিস্থিতি বদলে গেল, যখন ‘অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে বাংলাভাষী মানুষদের ওপর দেশজুড়ে ধরপাকড় শুরু হয়। তখন প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে ‘নিপীড়ক’ হিসেবে বিজেপিকে চিহ্নিত করার ঘটনাও সামনে আসতে শুরু করে। গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অনেককে বাংলাদেশে পুশব্যাকের ঘটনায় রাজ্যের সাধারণ বাঙালিরা ক্ষুব্ধ। এসব ক্ষুব্ধ মানুষের মধ্যে মমতার অনুগতরা যেমন আছেন তেমনি পরিবর্তনের আশায় বিজেপির দিকে ঝুঁকে থাকারাও আছেন।

‘বাংলা কোনো ভাষা নয়’- বিজেপি সংশ্লিষ্টদের এমন মন্তব্য এবং দিল্লি পুলিশের ‘বাংলাদেশি ভাষার’ দোভাষী খোঁজার বিষয়টি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়, গর্ব এবং ইতিহাসের ওপর আঘাত বলেও বিবেচিত হচ্ছে। ফলে বাঙালির চোখে বিজেপি এমন এক দলে পরিণত হয়েছে, যারা মাছ-মাংস খাওয়ার মত খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে 'বাঙালি সত্তার' মূল ধারণাকেই আক্রমণ করছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতে, ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনকে সাধারণ আরেকটি নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি ‘নকশা’ করা হয়েছিল এক চূড়ান্ত লড়াই হিসেবে। এজন্য ভোটার তালিকা থেকে বিশাল সংখ্যক ‘অযোগ্য’ ভোটারদের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর নামে পরিচিত।

এসআইআরের অধীনে ‘অযোগ্য’ ঘোষিত এই ভোটারদের সিংহভাগ বাংলাভাষী (মূলত মুসলিম) এবং তাদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসআইআরের অধীনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ২০২৫ সালের জুনে বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন শুরু করার সময় সতর্ক করেছিল যে, এরপর পশ্চিমবঙ্গের পালা।

এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম ‘তোষণ’ এর অভিযোগ করে আসছে বিজেপিসহ বিরোধীরা। তার বিরুদ্ধে ভোটারদের একটি বড় অংশের মধ্যে গভীর ক্ষোভও ছিল। তবে বর্তমানে এসআইআরের অধীনে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ার নিচে তা চাপা পড়ে গেছে।

এসআইআর এখন বিপুল সংখ্যক ভোটারের কাছে একটি ‘ব্যক্তিগত লড়াই’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ায় বা পর্যবেক্ষণে রাখায় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ।

রাজনৈতিক আলোচনায় এখন ভোটারদের নতুন এক শ্রেণিকরণ তৈরি হয়েছে, যাদের নামের পাশে লেখা ‘বিচারধীন’। বিষয়টি এতটাই জটিল হয়ে পড়েছে যে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছে।

এসআইআর এর ফলে প্রায় সাড়ে ৩৪ লাখ মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার মুখে থাকায় আদালত এ পদক্ষেপ নিয়েছে। শুনানি ছাড়াই আগের ভোটার তালিকা স্থগিত করার বিষয়ে বর্তমানে ইসির সিদ্ধান্ত বাতিল হয়েছে; যেটিকে জনগণের পক্ষে ‘নিজের জয়’ হিসেবে তুলে ধরছেন মমতা।

নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে এই এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রতি বিজেপির অন্ধ সমর্থন তাদের নিজেদের ভোটারদেরও অনেক জেলায় বিপাকে ফেলেছে। বিশেষ করে মতুয়া সম্প্রদায়ের মতো উদ্বাস্তু গোষ্ঠীগুলো এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপির শীর্ষ নেতা অমিত শাহ দেশটির পার্লামেন্টে এসআইআর এর উদ্দেশ্য হিসেবে ‘অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত’, তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া এবং বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ‘সরকারবিরোধী হাওয়ার’ চেয়ে এসআইআরই আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ স্পষ্ট। এ পদক্ষেপের প্রভাবে ৯১ লাখ ভোটারের নাম হয় বাদ গেছে, নয়ত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। ভোটার সংখ্যা ৭ দশমিক ৮ কোটি থেকে কমে নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৪৪ কোটিতে।

অপরদিকে এবারের ভোট একদিকে তৃণমূল বনাম ইসি এবং আরেকদিকে তৃণমূল বনাম বিজেপির দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের পরও বিজেপি যেভাবে এসআইআর প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে চলেছে, তাতে ভোটারদের চোখে ইসি ও বিজেপি এখন পরিণত হয়েছে অভিন্ন সত্তায়।

তবে পশ্চিমবঙ্গে সরকারবিরোধী ‘অসন্তোষ’ যে নেই তা নয়। কিন্তু ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ এবং ‘স্বাস্থ্যসাথী’ এর মত সরাসরি সরকারি সুবিধা দেওয়ার প্রকল্পগুলোর কারণে নারীদের মধ্যে মমতার প্রতি ব্যাপক সমর্থনও রয়েছে।

বিজেপি তাদের ইশতেহারে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ এর নাম বদলে ‘মাতৃশক্তি ভরসা’ প্রকল্প করে টাকা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে তা দিয়ে মমতার প্রতি নারীদের এ আনুগত্য কেনা সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ ভোটার তালিকা থেকে ৫৭ লাখ নারীর নাম বাদ পড়ার পদক্ষেপ মমতার সবচেয়ে বড় ‘ভোটব্যাংকে’ আঘাত করেছে। আগের বিধানসভা নির্বাচনে ৫০ শতাংশের বেশি নারী মমতাকে ভোট দিয়েছিলেন।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনকালীন সময়ের তুলনায় এখনকার পার্থক্য হল- তৃণমূল থেকে আগের মত গণহারে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার হিড়িকও আর নেই। বরং গত পাঁচ বছরে বিজেপি থেকে তৃণমূলে ফেরার স্রোত দেখা গেছে, যার সাম্প্রতিক উদাহরণ শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী পবিত্র কর, যিনি নন্দীগ্রাম থেকে তৃণমূলের প্রার্থী।

টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, যখন একটি রাজ্যের নির্বাচন ‘সুশাসনের লড়াই’ না হয়ে প্রতিবেশী দেশের পটপরিবর্তন এবং জাতিগত পরিচয়ের লড়াইয়ে রূপ নেয়, তখন রাজনীতি হয়ে ওঠে আবেগ তাড়িত করার প্রতিযোগিতা। প্রশ্ন হল, বিজেপি কি তৃণমূলকে 'অনুপ্রবেশকারীদের মদদদাতা' হিসেবে প্রমাণ করতে পেরেছে, নাকি তৃণমূল বিজেপিকে ‘বাঙালিবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে সফল হয়েছে?

এ লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ), যারা মুসলিম ও দলিত ভোট ভাগ করে তৃণমূলের ক্ষতি করতে পারে।

প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী- তৃণমূল ও বিজেপি উভয়েই নিজেদের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছে। বিজেপির বয়ানে, বাঙালি জাতিকে সেসব মুসলিম থেকে মুক্ত করতে হবে, যারা অবৈধভাবে আশ্রয় নিয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূলের বয়ানে, বাংলা ও ভারতের যে ধর্মনিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আদর্শ, তাকে বিজেপির হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।

২০২৬ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের স্লোগান হল- ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা।’ বাংলার পরিচয় এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ‘রক্ষক’ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাইছেন, তৃণমূলের নিচুতলার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে থাকা বৈধ জনক্ষোভকে আবেগের জোয়ারে ভাসিয়ে দিতে।

আজকালের খবর/ এমকে









Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট এবার ‘এসআইআর’ আর ‘সরকারবিরোধী’ শিবিরের লড়াই
পাকিস্তানে আজই ইরানের সঙ্গে চুক্তি সই হবে : ট্রাম্প
সহজ জয়ে সমতায় ফিরল বাংলাদেশ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
জনগণের কথা ভেবে তেলের দাম সামান্য বাড়িয়েছে সরকার: জ্বালানি মন্ত্রী
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ ও হয়রানির প্রতিবাদে বিক্ষোভ
সোমবার থেকে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াচ্ছে বিপিসি
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft