কুমিল্লার দেবীদ্বারে প্রবাস ফেরত স্বামীর নেশার টাকা জোগানে ব্যর্থ স্ত্রীকে প্রতিনিয়ত নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত শরীরে যন্ত্রণায় এক গৃহবধূ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করার অভিযোগ উঠেছে।
জাতীয় সেবা ৯৯৯’-এ ফোনে আসা পুলিশের সহযোগিতায় ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় নিহত গৃহবধূর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে লাশ ময়না তদন্তের জন্য কুমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে রবিবার (২৯ মার্চ) দুপুর একটায় দেবীদ্বার পৌর এলাকার দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজের উত্তর গেট সংলগ্ন মোসলেম মিয়ার পঞ্চম তলা ভবনের তৃতীয় তলার ভাড়াটিয়া আবু ইউছুফের বাসায়।
নিহত গৃহবধূ সাবিনা ইয়াছমিন (৩২) মুরাদনগর উপজেলার ১৯ নং দারোরা ইউনিয়নের দারোরা গ্রামের আবুল কাসেম খানের মেয়ে। প্রায় দেড় বছর পূর্বে প্রতিবেশী একই ইউনিয়নের পালাসূতা গ্রামের জাহাঙ্গীর মার্কেট সংলগ্ন আব্দুল বারেকের ছেলে বাহরাইন ফেরত আবু ইউছুফ (৩৩) এর সাথে সাবিনা ইয়াছমিনের প্রেমের সম্পর্কে বিয়ে হয়। বিয়ের পর উভয় পরিবার মেনে না নেয়ায় তারা দেবীদ্বার সদরে ভাড়া বাসায় গত দেড় বছর ধরে বসবাস করে আসছিলেন।
পুলিশ ও স্বজনরা জানান, গত ঈদে গৃহবধূ ও স্বামী যার যার পিত্রালয়ে চলে যায়। ঈদের পর গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) স্বামী বাসায় আসবে বলে সাবিনা তার বাবার বাড়ি থেকে বাসায় চলে আসে। এরই মধ্যে সাবিনার দু’টি সিমকার্ড তার স্বামী নস্ট করে দিলে, সমস্ত ডকুমেন্ট হারিয়ে যায়। গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) সিমকার্ড তুলে সকালে সাবিনা তার মায়ের সাথে কথা বলেন। সন্ধ্যার পর থেকে আর কারোর সাথে কোন যোগাযোগ হয়নি তার। রবিবার দুপুরে পঁচা গন্ধ পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশী আসমা আক্তার দুর্ঘন্ধযুক্ত কক্ষের ভেতর থেকে লক করা ঘরের দরজা নক করে কোন সাড়া পাননি। পরে জাতীয় সেবা ৯৯৯’-এ ফোন করলে দেবীদ্বার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাগরের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে বাড়ির মালিকের সহায়তায় দরজা ভেঙ্গে ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেন।
এ ব্যপারে নিহতের খালা ইয়াছমিন আক্তার নিপা জানান, তার বোনের মেয়ে সাবিনা খুবই সুন্দরী ছিলেন। তাকে নেশার টাকার জন্য তার স্বামী প্রায়ই নির্যাতন করত। ফর্সা শরীরের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন ছিলনা। গত কিছুদিন আগে বাবার বাড়ি থেকে নেশার টাকা এনেদিতে নির্যাতনে একটি চোখ ক্ষত করে ফেলে। সংবাদ পেয়ে অচেতন অবস্থায় হাসপাতাল নিয়ে আসি। তার স্বামী সংবাদ পেয়ে হাসপাতালে এসেও তাকে লাথি, কিল, ঘুষি মেরে হত্যার চেষ্টা করে। আমি তাকে হাতে পায়ে ধরে মারধর থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করি।
নিহতার ছোট ভাই মো. রাসেল খান জানান, পূর্বে তার বোনকে একজন ওয়ার্কশপ মালিকের সাথে বিয়ে দেন। ওই সংসার কয়েক বছর স্থায়ী হলেও স্থায়ী হয়নি। পরে মালয়েশিয়া প্রবাসী আরো একজনের সাথে বিয়ে হয়। এসময় প্রতিবেশী বাহরাইন প্রবাসী আবু ইউছুফ প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাকে বিয়ে করে। এ ঘটনায় আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। আবু ইউছুফ নেশাগ্রস্থ ছিল। মাদকের দায়ে বাহরাইন ২ মাসের জেল খাটার পর ওই দেশের সরকার তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়।
নিহতার মা নিলু বেগম জানান, তার সাথে শেষ কথা হয়েছে গত শুক্রবার, আজ সে আমাদের বাড়ি আসার কথা ছিল।
দেবীদ্বার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাগর জানান, স্থানীয় ও পরিবারের পক্ষ থেকে যা জেনেছি, তাতে মনে হয়, স্বামী নেশাখোর হওয়ায় স্ত্রীকে নেশার টাকার জন্য প্রায়ই প্রেসারে রাখত, মারধর ও নির্যাতন করত। নিহতের তিনিটি বিয়ে হয়েছে। তবে তার কোনো সন্তান নাই। তার বর্তমান স্বামীর ১১ বছর বয়সী একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। ময়না তদন্তের পর এবং মোবাইল ট্রেকিং ও পলাতক স্বামী আবু ইউছুফকে আটকের পর তদন্ত স্বাপেক্ষে বিস্তারিত বলা যাবে। লাশের সুরতহাল তৈরি করে মর্গে পাঠিয়েছি।
আজকালের খবর/বিএস