ডিমলা উপজেলা-এ তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের ধারাবাহিক সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকলেও প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থামছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান শেষ হলেই নদীর তলদেশে গভীর গর্ত তৈরি করে পুনরায় শুরু হয় পাথর লুট।
গত বৃহস্পতিবার দুর্গম চরাঞ্চল পাড়ি দিয়ে পরিচালিত এক যৌথ অভিযানে পাথর উত্তোলনে ব্যবহৃত ৫টি বোমা মেশিন৬টি ইঞ্জিনচালিত শ্যালো মেশিন১১টি নৌকা ধ্বংস করা হয়। এছাড়া বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ জব্দ করা হয়েছে।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রওশন কবির। সহযোগিতা করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর রংপুর ব্যাটালিয়ন (৫১ বিজিবি), ডিমলা থানা পুলিশ ও আনসার ভিডিপি সদস্যরা।
প্রশাসনের দাবি, অবৈধ ভাবে পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট, তেলীর বাজার, তিস্তা বাজার ও চরখড়িবাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি চক্র নির্বিচারে পাথর উত্তোলন করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য প্রশাসনের গাড়ি দেখলেই কাজ বন্ধ থাকে। অভিযান শেষ হলেই আবার গভীর খাদ কেটে পাথর তোলা শুরু হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সংরক্ষিত এলাকায় উত্তোলিত পাথর স্তূপ করে রাখার সুযোগ দিয়ে একটি পক্ষ পরোক্ষভাবে এই অবৈধ বাণিজ্যকে সহায়তা করছে।
অবৈধ পাথর উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ও তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলেই নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
গত বর্ষায় ডিমলা উপজেলার ১০ ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত ৬টিতে তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ছোট খাতা সুপরিটরি গ্রামে শত শত একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে নতুন চ্যানেল সৃষ্টি হয়েছে। বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তলদেশ থেকে অতিরিক্ত পাথর উত্তোলন করলে নদীর গভীরতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, ফলে স্রোতের চাপ তীরে বেশি পড়ে এবং ভাঙন ত্বরান্বিত হয়।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রতিবছর নদীভাঙন রোধে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিজ্ঞ মহলের মতে, একদিকে ভাঙনরোধ প্রকল্প বাস্তবায়ন, অন্যদিকে একই নদী থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন—এই দ্বৈত পরিস্থিতিতে নদী রক্ষা প্রকল্পগুলো কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, অবৈধ পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। এটি অবৈধ উত্তোলনকারীদের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন—শুধু যন্ত্র ধ্বংস করলেই কি সিন্ডিকেট থামবে?
তাদের দাবি ধারাবাহিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা ও গ্রেপ্তার নিশ্চিত করতে হবে। নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে।
জবাবদিহিমূলক তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; এটি ডিমলার কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশের প্রাণ। অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনিক অভিযান যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
নদী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে—এই প্রত্যাশায় ডিমলার সচেতন মহল এখন কার্যকর ও স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায়।
কাওছার আল হাবীব/আজকালের খবর