প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ৫:২২ পিএম (ভিজিট : )

ইরানের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক অভিভাবক আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর শাহাদাত বরণ কেবল একটি রাষ্ট্রের নেতার মৃত্যু নয়, বরং এটি বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর হৃদপিণ্ডে একটি বিষাক্ত তীরের আঘাত।
পবিত্র রমজান মাসের পবিত্রতা লঙ্ঘন করে খামেনীর শাহাদাতের পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত এই বর্বরোচিত হামলা এক চরম নিষ্ঠুর ও পরিকল্পিত আগ্রাসন। এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং ধর্মীয় মর্যাদার ওপর এক নগ্ন হস্তক্ষেপ। এই হামলা শুধু ইরানের সার্বভৌমত্বকে বিদ্ধ করেনি, বরং পুরো মুসলিম বিশ্বের অস্তিত্বকে আজ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
খামেনীর বিদায় ও আগ্রাসনের নতুন মাত্রা। আলী খামেনীর মতো একজন আপোষহীন নেতার অবর্তমানে তেহরানের ওপর যে বোমা বর্ষিত হচ্ছে, তা আসলে একটি জাতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার হীন প্রচেষ্টা। শিশু, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর এই নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটি স্রেফ আধুনিক যুগের বর্বরতা। যখন ইরানের প্রতিটি ঘর আজ শোকাতুর, ঠিক তখনই পশ্চিমা শক্তির এই তান্ডব প্রমাণ করে যে, তাদের কাছে 'মানবাধিকার' কেবল একটি শাব্দিক বিলাসিতা।
মুসলিম বিশ্বের নীরবতা এক কলঙ্কিত আত্মসমর্পণ। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো তথাকথিত 'মুসলিম পরাশক্তি' দেশগুলোর নীরবতা। সৌদি আরব, কাতার, ওমান কিংবা কুয়েত তাদের এই নিস্পৃহতা কেবল রাজনৈতিক দ্বিধা নয়, এটি একটি চরম নৈতিক সংকট। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই মুসলিম দেশগুলো শক্তিশালী আগ্রাসীর সামনে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে, তখনই সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিয়েছে। এই নীরবতা আসলে আগ্রাসীদের আরও উগ্র হতে উৎসাহিত করছে। আপনারা কি সত্যিই মুসলিম? নাকি শক্তিশালী রাষ্ট্রের দাসত্বই এখন আপনাদের স্বার্থপরতার প্রধান নিদর্শন?
প্রতিরোধের অধিকার ও দ্বিমুখী নীতি কেন? ইরান যখন তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পাল্টা ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, তখন তথাকথিত সভ্য বিশ্ব এবং কিছু মুসলিম দেশ একে 'উস্কানি' বলে নিন্দা জানায়। অথচ আগ্রাসকদের বোমাবর্ষণকে তারা 'আত্মরক্ষা' বলে চালিয়ে দেয়। আগ্রাসন এবং প্রতিরোধকে যদি সমান মানদণ্ডে বিচার না করা হয়, তবে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং পৃথিবী এক ভয়াবহ অরাজকতার দিকে ধাবিত হবে।
এ যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতির মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে। গায়েপড়ে চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দুবাই, এরবিল বা দোহায় হামলার আশঙ্কা প্রমাণ করে যে, এই আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। হরমুজ প্রণালী যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হবে। মুদ্রাস্ফীতির কারনে বিশ্বজুড়ে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক বাজার ধসে পড়ার উপক্রম হবে।
পরাশক্তির কলকাঠি রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা: এই রণক্ষেত্রে পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছে রাশিয়া ও চীন। রাশিয়ার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া। তাই তারা ইরানকে উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে। অন্যদিকে চীন খেলছে 'সক্রিয় নিরপেক্ষতার' চাল। বেইজিং জানে, তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা ইরানের ওপর নির্ভরশীল। তারা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বদলে বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনীর শাহাদাতের পর পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচ্ছে, তাতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছায়াকে আর উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আঞ্চলিক এই বিস্ফোরণ এখন বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। মুসলিম দেশগুলোর জন্য এখন কেবল শোক প্রকাশ বা কাগুজে বিবৃতি দেওয়ার সময় নয়; বরং ঐক্যবদ্ধ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার শেষ সুযোগ।
যদি আজ আমরা ইরানের পাশে না দাঁড়াই, তবে কাল এই আগুনের আঁচ থেকে মক্কা-মদিনা কিংবা কায়রো কোনোটিই নিরাপদ থাকবে না। সময়ের দাবি হলো সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
লেখক: সাংবাদিক, সমাজ গবেষক এবং মহাসচিব-কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ।
www.mirabdulalim.com