বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগ সব সময়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে-এটি কি প্রকৃত যোগ্যতার স্বীকৃতি, নাকি অদৃশ্য কোনো যোগসূত্রের প্রভাব? বিষয়টি কেবল ব্যক্তি নিয়োগের নয়; এটি উচ্চশিক্ষার মান, স্বায়ত্তশাসন ও সুশাসনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, যেখানে রাষ্ট্রপতি-চ্যান্সেলর হিসেবে ভিসি নিয়োগ দেন। বাস্তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ ও রাজনৈতিক বিবেচনাই প্রায়শই মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে প্রশ্ন জাগে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কতটা স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয়?
এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অন্যত্র ভিসি হতে পারেন—এটি নীতিগতভাবে অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই অভিজ্ঞ অধ্যাপকরা ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন। যেমন যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বা ভারতের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশ-বিদেশ থেকে আবেদন নিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় যখন উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, প্রকাশ্য মানদণ্ড ও জবাবদিহিতা স্পষ্ট থাকে না, তখন আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগ সন্দেহের জন্ম দেয়।
ভিসি পদ কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি একাডেমিক নেতৃত্বের প্রতীক। একজন উপাচার্যকে গবেষণা, শিক্ষা, অর্থ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক ও সামগ্রিক সুশাসনে দক্ষ হতে হয়। যদি নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতার সূচক, যেমন গবেষণা প্রকাশনা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা, নৈতিক সুনাম প্রকাশ্যে মূল্যায়ন না করা হয়, তবে 'যোগ্যতা' শব্দটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব একাডেমিক সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক ঐতিহ্য বহন করে আসছে। বাইরের কোনো শিক্ষক সেখানে নেতৃত্বে এলে তিনি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনতে পারেন-এটি ইতিবাচক। তবে যদি সেই নিয়োগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট, সিন্ডিকেট বা শিক্ষকসমাজের মতামত উপেক্ষিত হয়, তাহলে নেতৃত্বের বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং শুরু থেকেই আস্থার সংকট তৈরি হয়।
অনেকে যুক্তি দেন, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরে থেকে কাউকে ভিসি করা হলে দলাদলি কমে। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই ভিন্ন চিত্র দেখায়। যদি যোগ্য ব্যক্তির নিয়োগ রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতেও হয়, তবে তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয়েই যান না কেন, সেখানে একাডেমিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, যা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ওপর পজিটিভ প্রভাবই ফেলবে।
সমস্যার মূল জায়গাটি তাই প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা। ভিসি নিয়োগে একটি স্বাধীন সার্চ কমিটি, প্রকাশ্য যোগ্যতার মানদণ্ড, সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ, এমনকি প্রার্থীদের ভিশন উপস্থাপনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রার্থীরা উন্মুক্ত ফোরামে তাদের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অংশীজনরা ধারণা পান, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কোন পথে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে চান।
সরকার যদি সত্যিই উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন, তবে ভিসি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি জ্ঞানচর্চার স্বাধীন ক্ষেত্র। সেখানে নেতৃত্বের প্রশ্নে সামান্য আপসও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
'এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অন্যত্র ভিসি'-এই প্রথা নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা হলো এর পেছনের অস্বচ্ছতা। যোগ্য শিক্ষক না থাকলে কোনো প্রশ্ন নেই, কিন্ত যোগ্য শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও বাইরে থেকে ভিসি/প্রোভিসি/ট্রেজারার নিয়োগ দেয়া কতটা যৌক্তিক তা সংশ্লিষ্ট মহল ভেবে দেখবেন। কিছু বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে বাইরের শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হলে প্রক্রিয়া বুঝতেই দুই বৎসর কেটে যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব হয় না।যোগ্যতা যদি হয় একমাত্র মানদণ্ড, তবে যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দেশের যে কোনো প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিতে পারেন। কিন্তু যদি যোগসূত্রই প্রধান নির্ধারক হয়, তবে তা উচ্চশিক্ষার ভিত্তিকে দুর্বল করবে।
অতএব সময় এসেছে স্পষ্ট নীতিমালা, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভিসি নিয়োগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার। উচ্চশিক্ষার মর্যাদা রক্ষায় এ বিষয়ে সরকারের দূরদর্শী ও সাহসী সিদ্ধান্তই হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।