দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির চাকা সচল করে জনমনে স্বস্থি ফিরিয়ে দেয়া বর্তমান সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে বিনিয়োগ স্থবিরতা অতিক্রম করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি,রপ্তানী আয় স্বাভাবিক ধারায় ফেরানো,নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রেও রয়েছে চ্যালেঞ্জ। ‘ক্ষমতা গ্রহণের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী তথা তথা তার সরকারকে এসব চ্যালেঞ্জ অত্যন্ত দক্ষতা, বিচক্ষণতা এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে অতিক্রম করে দেশের মানুষকে স্বস্থি দেয়ার বিকল্প নেই। বিশেষ করে বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি এবং দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা’, কাটিয়ে ওঠা নতুন সরকার,নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
উল্লেখ্য, অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই এক ধরনের স্থবিরতা, অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতা কাজ করছে, যা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদুপরি আর্থিক খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া কিছু সংস্কার কার্যক্রম অসমাপ্ত অবস্থায় রয়ে গেছে। এসব সংস্কার শেষ করার দায়িত্ব এখন নির্বাচিত সরকারের ওপর। কিন্তু এসব কাজ করা দুরহ। কারণ নতুন সরকারকে সামাল দিতে হবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং বাড়তে থাকা সরকারি ব্যয়ের চাপ। এরমধ্যে ‘বর্তমানে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিনিয়োগ কমে যাওয়া। বিনিয়োগ না থাকলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না, উৎপাদন বাড়ে না এবং অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে চাপে থাকে,মানুষ কষ্টে থাকে,ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। কাজেই এসব করতে হবে দ্রুততার সঙ্গে।
অন্যদিকে, ‘শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এখন বড় সংকটে পড়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে উচ্চ সুদের হার ও নানা ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। এমন একসময়ে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, যখন বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় থেমে আছে। রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতেও সমস্যা হতে পারে। আবার পে স্কেল বাস্তবায়ন হলে বাজারের এর নেতিবাচাক প্রভাব পড়বে। তখন সরকারি চাকারির বাইরে বসবাসরত দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য তা হয়ে পড়বে‘ঘোদের উপর বিষ ফোঁড়’ হিসেবে। তাছাড়া উত্তরাধিকার সূত্রে রেখে যাওয়া দেশের উন্নয়ন ব্যয়ের অবস্থা নতুন সরকারের জন্য স্বস্তির নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার খুবই কম। এর ফলে অর্থনীতিতে যে চাহিদা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা হচ্ছে না। উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতির প্রভাব পড়ছে বেসরকারি খাতের ওপরও। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ খাতে কম ব্যয় ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। গত দেড় বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক কারখানায় লাখো মানুষ কাজ হারিয়েছে। কর্মসংস্থান না বাড়ায় সাধারণ মানুষের আয়ও বাড়ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়ে। এ বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রমজান ও ঈদুল ফিতরের চাপ। দায়িত্ব নেয়ার পরপরই নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হবে রমজানের বাজার নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু এ বাজার পরিস্থিতি শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা, কম বিনিয়োগ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা। ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি নতুন সরকারের জন্য মাথাব্যথার কারণ।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরও গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি ব্যাংক ও আর্থিক খাতের উপর। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ এখন শিল্পের সহায়ক না হয়ে বোঝায় পরিণত হয়েছে। সরকারের বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়ার কারণে বেসরকারি খাত ঋণ সংকটে পড়ছে। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে। খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা স্থিতিশীল হলেও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম এখনো বেশি। কাজেই এটি এখন আর সাময়িক সমস্যা নয়; বরং একটি কাঠামোগত সমস্যায় রূপ নিয়েছে। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সরবরাহ ব্যবস্থা, মজুত ব্যবস্থাপনা ও বাজার তদারকিতে সংস্কার দরকার। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও নতুন সরকার কঠিন অবস্থার মুখে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধেই রাজস্ব ঘাটতি বড় আকার ধারণ করেছে। করদাতার সংখ্যা বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় কমানো এবং কর ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা না আনলে এ ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ নিয়ে ঘাটতি মেটানোর প্রবণতা বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও সংকুচিত করতে পারে।
প্রসঙ্গত: সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি উৎস মিলিয়ে সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই (জুলাই-ডিসেম্বর) সরকার নতুন করে নিয়েছে আরও ৭৪ হাজার কোটির বেশি ঋণ। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সরকারি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। শুধু ব্যাংকিং খাত থেকেই গত এক বছরে সরকারের ঋণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২৫ সালে ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ—যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে যেখানে সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল সাড়ে ২০ শতাংশের কাছাকাছি, বাস্তবে তা প্রায় ২৯ শতাংশে পৌঁছায়।
সরকারের বাড়তি ঋণগ্রহণের বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আশানুরূপ বাড়েনি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় মাত্র ৬ দশমিক ১ শতাংশে, যা লক্ষ্যমাত্রার নিচে। উচ্চ সুদহার, নীতি সুদ ১০ শতাংশে স্থির থাকা এবং ব্যাংক ঋণের সুদ ১৪-১৫ শতাংশে ওঠে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমেছে উদ্যোক্তাদের। এ কারণে দেশে কর্মসংস্থান কমেছে,বেড়েছে বেকারত্ব। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘ক্রাউডিং আউট’যখন সরকার বেশি ঋণ নেয়, তখন বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের জোগান সংকুচিত হয়।
বর্তমানে অর্থনীতিতে সেই চাপ স্পষ্ট। উল্লেখ্য, আগামী নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে। এটা নিয়েও চলছে আলোচনা। ব্যবসায়ীরা এলডিসি উত্তরণের সময় ৩-৫ বছর পিছিয়ে দেয়ার দাবির প্রেক্ষিতে ৩ বছর এর মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করবে সরকার। কাজেই এ ক্ষেত্রে আপাতত স্বস্থি সরকারের। তবে সরকারের অগ্রাধিকার নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষকদের জন্য ‘ফারমার্স কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা সঠিক ভাবে বাবস্তবায়ন হলে অর্থন ীতি গতি পাবে আশা করা যায়।
এমনি অবস্থায় দেশের অর্থনীতির বহুমাত্রিক সংকট উত্তরনের গুরু দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক বিষয়ক কর্মকান্ডে সক্রিয় ভূমিকার কারণে দলীয় ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে জনাব আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সুপরিচিত। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, বাজেট প্রণয়ন, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং আর্থিক খাত সংস্কারে গতি আসবে,আলো ফিরবে হতাশায় নিমজ্জিত বৃহত্তর জনগৌষ্টির মাঝে,স্বস্থি মিলবে জনমনে এই প্রত্যাশা করাই যেতে পারে। তদুপরি রাষ্ট্র পরিচালনায় বিগত সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনে অভিজ্ঞতা রয়েছে রাজনীতিতে অত্যন্ত ত্যাগী,সহসী এবং নিষ্টাবান এই রাজনীতিবিদের। তাই অর্থনীততে জমে থাকা পাহাড়সম সমস্যার সমাধানে তিনি সফল হবেন জনপ্রত্যাশা পূরণে। তাছাড়া বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টার তৈরি ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং নীতি-অগ্রাধিকার’ শীর্ষক রেখে যাওয়া নথিতে বলা হয়েছে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাত সংস্কারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন কাজ শুরুর চেয়ে চলমান সংস্কার জোরদার করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। কাজেই নতুন অর্থমন্ত্রীর আগামীর পথচলায় এই পরামর্শও সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্পাদক-ক্লাইমেট জার্নাল২৪.কম,সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম।
২৮ফেব্রুয়ারী,২০২৬ ইং।